ঢাকা

প্রযুক্তির দাপটেও হাতে লেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন মার্কিন অধ্যাপক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শিক্ষা ও গবেষণার জগতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশ্বের নানা দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণাপত্র এমনকি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও এআইভিত্তিক টুলের ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভর করছেন। তবে প্রযুক্তির এই দ্রুত বিস্তারের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্নধর্মী বার্তা দিচ্ছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়–এর মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জামিল জাকি।

তাঁর মতে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বিকাশের জন্য হাতে লেখা এখনো অপরিহার্য।

প্রযুক্তির ওপর বাড়ছে নির্ভরতা

উচ্চশিক্ষাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইড হায়ার পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮৫ শতাংশ কলেজশিক্ষার্থী পড়াশোনায় কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছেন। অনেক শিক্ষার্থী প্রবন্ধ বা গবেষণাপত্রের বড় অংশই চ্যাটবটের সহায়তায় তৈরি করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে সময় সাশ্রয় হলেও চিন্তার স্বতন্ত্রতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

‘টেক-ফ্রি’ শ্রেণিকক্ষের উদ্যোগ

এই বাস্তবতায় অধ্যাপক জামিল জাকি তাঁর ক্লাসকে “টেক-ফ্রি” বা প্রযুক্তিমুক্ত ঘোষণা করেছেন। ২০২৪ সাল থেকে তাঁর পরিচালিত কোর্সগুলোর পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের কাগজ-কলমে হাতে লিখে উত্তর দিতে হচ্ছে।

তাঁর মতে, লেখালেখি শুধু তথ্য সাজানোর কাজ নয়; এটি মানুষের চিন্তা, যুক্তি ও আত্মপ্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।

হাতে লেখার পক্ষে তিনটি প্রধান যুক্তি
১. ভাষার স্বকীয়তা ও গভীরতা রক্ষা

জামিল জাকির মতে, এআই-নির্ভর লেখাগুলো অনেক সময় ভাষাগতভাবে পরিপাটি হলেও চিন্তার গভীরতা ও আবেগের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। তিনি এটিকে “টেক্সট পলিউশন” বা ভাষাগত দূষণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মানুষের লেখা কেবল তথ্যের বাহক নয়; এটি অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশও বটে।

২. মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা

মনোবিজ্ঞানীরা এআইয়ের অতিনির্ভরতাকে “কগনিটিভ সারেন্ডার” বা চিন্তার আত্মসমর্পণ বলে অভিহিত করেন। যখন মানুষ সব বিশ্লেষণ প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেয়, তখন নিজস্ব বিচারশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ভুল তথ্য বা দুর্বল যুক্তি দিলেও অনেক ব্যবহারকারী তা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন।

৩. লেখাই চিন্তার অনুশীলন

একটি সাদা কাগজ মানুষের সামনে একটি মানসিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এলোমেলো ভাবনাকে সংগঠিত করে শব্দে প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে যুক্তি, স্মৃতি ও মনোযোগের বিকাশ ঘটে।

নিয়মিত হাতে লেখা স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক বলেও বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও প্রাসঙ্গিক

বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অ্যাসাইনমেন্ট, প্রতিবেদন ও থিসিস লেখায় অনেক শিক্ষার্থী চ্যাটবটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছেন।

শিক্ষকদের মতে, এতে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব বিশ্লেষণ ও গবেষণার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সৃজনশীল চিন্তার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

চাকরিক্ষেত্রে কেন গুরুত্বপূর্ণ

কর্মক্ষেত্রে জটিল সমস্যা সমাধান, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নতুন ধারণা তৈরি করতে ব্যক্তিগত বিশ্লেষণী দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব দক্ষতা কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে অর্জন করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই একটি সহায়ক টুল হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই মানুষের মৌলিক চিন্তাশক্তির বিকল্প নয়।

লেখালেখি হোক মস্তিষ্কের ব্যায়াম

শরীর সুস্থ রাখতে যেমন নিয়মিত ব্যায়াম প্রয়োজন, তেমনি মস্তিষ্ক সচল রাখতে প্রয়োজন চিন্তা ও লেখার অনুশীলন। হাতে লেখা সেই অনুশীলনের অন্যতম কার্যকর উপায়।

অধ্যাপক জামিল জাকির বার্তা হলো—প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, তবে নিজের চিন্তা ও বিচারশক্তিকে প্রযুক্তির কাছে সমর্পণ করা যাবে না।

সব মিলিয়ে, এআই-নির্ভর যুগে হাতে লেখা শুধু একটি ঐতিহ্য নয়; এটি স্বাধীন চিন্তা, গভীর উপলব্ধি এবং সৃজনশীলতার ভিত্তি হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স