সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশের জন্য সংসদের উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও টক শো আলোচকেরা। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, একক রাষ্ট্রব্যবস্থার বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সভায় একজন ব্যক্তির জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার প্রস্তাব নিয়েও ভিন্নমত উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সঙ্গে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং টক শো ব্যক্তিত্বদের এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আলোচনার বিষয়গুলো সাংবাদিকদের জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা উচ্চকক্ষ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে ছিল, বর্তমানে দেশের এককক্ষবিশিষ্ট সংসদই এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় উচ্চকক্ষ গঠন করলে সেটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে আগে আলোচনা প্রয়োজন।
উচ্চকক্ষ গঠন করলে রাষ্ট্রের ব্যয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও আলোচনায় এসেছে। এ কারণে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ।
সভা শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। বিশেষ কমিটি সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এগোতে চায়। তবে মতবিনিময় সভায় যেসব নতুন প্রস্তাব এসেছে, সংসদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সেগুলো বিবেচনা করলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
অর্থাৎ, কমিটির পক্ষ থেকে উচ্চকক্ষের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অবস্থান পরিবর্তনের কথা জানানো হয়নি। বরং জুলাই জাতীয় সনদের সিদ্ধান্ত এবং মতবিনিময় সভায় উঠে আসা ভিন্নমতের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নিয়ে ভিন্নমত
জুলাই জাতীয় সনদের একটি প্রস্তাবে একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন—এমন বিধান করার কথা বলা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, বিএনপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।
তবে মঙ্গলবারের মতবিনিময় সভায় এ বিধান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ মনে করেন, একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়সীমা সংবিধানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক হতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, মতবিনিময় সভায় কেউ কেউ ১০ বছরের মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাবকে অগণতান্ত্রিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি ঠেকানোর চিন্তা থেকেই এ প্রস্তাব সামনে এসেছিল।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি এ বিষয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদে নতুন কোনো প্রস্তাব এলে তখন তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—১০ বছরের সীমা নিয়ে সভায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত এবং জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্ববর্তী ঐকমত্য একই বিষয় নয়। সভায় উঠে আসা মতামতগুলোকে বিশেষ কমিটি পরবর্তী আলোচনায় বিবেচনা করতে পারে, কিন্তু সেগুলো নিজেরাই কোনো সিদ্ধান্ত বা সংশোধিত বিধান নয়।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সমঝোতার কথা
জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেসব বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ আছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল আলোচনায় এলে জুলাই সনদের কিছু বিষয়ে তাদের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণয়ন ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে চায়। তবে বিরোধী দলের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ খোঁজা সম্ভব। এ জন্য বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
বিশেষ কমিটির বৈঠকগুলোতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি আগেও আলোচনায় এসেছে। কমিটির পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য বিরোধী দলকে আলোচনায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও আলোচনা
মতবিনিময় সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার একটি স্থায়ী কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে এবং কারা এতে থাকবেন—এ বিষয়ে বিশেষ কমিটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবের কিছু জায়গায় ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপদ্ধতি ও সরকারের কাঠামো কী হবে, তা নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে প্রস্তাব নিয়ে সেগুলো বিবেচনা করে সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। বিশেষ কমিটি সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব মতামত সংগ্রহ করছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য
মতবিনিময় সভায় শুধু উচ্চকক্ষ বা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নয়, সংবিধানের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতামত দেওয়া হয়েছে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার স্থায়ী কাঠামো নির্ধারণের পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা এবং সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব এসেছে।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনায় মতামত দেওয়া হয়। পাশাপাশি সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাবও এসেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষ কমিটির সভাপতি।
লিখিত প্রস্তাব চেয়েছে বিশেষ কমিটি
মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু মৌখিক আলোচনার মধ্যে বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন প্রস্তাব নথিভুক্ত করে পরবর্তী পর্যায়ে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে চায় কমিটি।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কোন প্রস্তাব বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন এবং শেষ পর্যন্ত সংসদে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কারা মত দিয়েছেন
মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও টক শো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, এশিয়ান টিভির সিইও হাসনাইন খুরশিদ, যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ, আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন এবং ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ।
টক শো ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত, আব্দুন নূর তুষার ও সাহেদ আলম।
সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মাহমুদুল হক।
সামনে আরও মতবিনিময়
সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার ধারাবাহিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও টক শো আলোচকদের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, নারী নেতৃত্ব, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে উচ্চকক্ষ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য—এসব বিষয়ে মঙ্গলবারের সভায় উঠে আসা মতামতগুলো এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বরং সংবিধান সংশোধন নিয়ে চলমান বৃহত্তর পরামর্শ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এগুলো পরবর্তী আলোচনা ও সংসদীয় বিবেচনার জন্য সামনে এসেছে।