ঢাকা

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা জালিয়াতি রোধে কৌশল নির্ধারণে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের ছাত্র ভিসা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে তিন দফা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে দেশটির শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জোট Russell Group। সংগঠনটি বলছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ভিসা জালিয়াতির ঘটনা রোধে এমন কোনো ‘ব্ল্যাঙ্কেট’ বা সামগ্রিক বিধিনিষেধ আরোপ করা উচিত নয়, যা প্রকৃত ও যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করে।

যুক্তরাজ্য সরকার সম্প্রতি শিক্ষার্থী ভিসা স্পনসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আরও কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাসেল গ্রুপ তাদের অবস্থান তুলে ধরে একটি তিন দফা পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির দাবি, লক্ষ্যভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভিসা জালিয়াতি মোকাবিলা করা সম্ভব, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষার আকর্ষণও অক্ষুণ্ন রাখা যাবে।

বর্তমানে রাসেল গ্রুপের সদস্য ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকেন। ফলে ছাত্র ভিসা নীতির পরিবর্তন তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বৈধ আবেদনকারী

রাসেল গ্রুপের মতে, যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই প্রকৃত ও বৈধ আবেদনকারী। তাঁরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ সমৃদ্ধ করেন না, স্থানীয় অর্থনীতি, গবেষণা কার্যক্রম এবং সামাজিক বৈচিত্র্যেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনমনে যে ধারণা তৈরি হয়, বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে ভিন্ন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যেই যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেন। ফলে শিক্ষার্থী ভিসাকে স্থায়ী অভিবাসনের পথ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতে, কিছু সংখ্যক প্রতারণামূলক আবেদনকারীর কারণে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তা যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভিসা জালিয়াতি রোধে তিন দফা প্রস্তাব

ছাত্র ভিসা ব্যবস্থায় আস্থা বজায় রাখতে এবং জালিয়াতি শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে রাসেল গ্রুপ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে UK Visas and Immigration (UKVI)-এর কাছে থাকা জাল নথি, আঞ্চলিক প্রতারণার ধারা এবং শিক্ষার্থী নিয়োগকারী এজেন্টদের আচরণসংক্রান্ত তথ্যের সরাসরি প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, এসব তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হাতে থাকলে আবেদন যাচাইয়ের সময় ঝুঁকিপূর্ণ আবেদন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, ভিসা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য বর্তমান ১০ বছরের পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞার চেয়েও কঠোর শাস্তির বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, কঠোর শাস্তি সম্ভাব্য প্রতারকদের জন্য কার্যকর প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় এবং UKVI-এর মধ্যে সরাসরি জালিয়াতি প্রতিবেদন ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন আবেদনকারীদের তথ্য কীভাবে ভাগাভাগি করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরিরও সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তথ্য বিনিময় করে প্রতারণামূলক আবেদন প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে।

‘ব্ল্যাঙ্কেট’ বিধিনিষেধের বিরোধিতা

রাসেল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক Libby Hackett বলেন, ছাত্র ভিসা পাওয়ার জন্য প্রতারণা বা ভুয়া তথ্য ব্যবহার পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

তিনি বলেন, “প্রতারণার মাধ্যমে ছাত্র ভিসা পাওয়ার চেষ্টা পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করে এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের সুযোগও ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি।”

তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে সব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ওপর সমানভাবে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা অনাকাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারে। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক ও লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।

ইতোমধ্যে কঠোর যাচাই-বাছাই করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

রাসেল গ্রুপ জানিয়েছে, তাদের সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একাধিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করছে।

এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীকে স্পনসর করার আগে Confirmation of Acceptance for Studies (CAS) ইস্যুর পূর্বে অতিরিক্ত অনুমোদন ধাপ সম্পন্ন করা। এছাড়া আবেদন মূল্যায়নের সময় বাধ্যতামূলকভাবে দ্বিতীয় কর্মকর্তার মাধ্যমে পুনরায় যাচাই করা হয়, যাতে কোনো ভুল বা জাল তথ্য নজর এড়িয়ে না যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবেদনকারীদের একাডেমিক সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সরাসরি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। একইভাবে ইংরেজি ভাষা দক্ষতার পরীক্ষার ফলও পরীক্ষাগ্রহণকারী সংস্থার সঙ্গে যাচাই করা হয়।

আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের জন্য জমা দেওয়া ব্যাংক নথি ও অন্যান্য আর্থিক কাগজপত্রও ব্যাংক এবং তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। ফলে আবেদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে জাল তথ্য শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

অভিবাসন নীতি ও উচ্চশিক্ষা খাতের ভারসাম্যের প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলমান রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্কের মধ্যেই রাসেল গ্রুপের এই অবস্থান সামনে এলো। একদিকে সরকার সামগ্রিক অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে চায়, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় খাত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক ও একাডেমিক গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু টিউশন ফি-ই নিয়ে আসে না; তারা গবেষণা, উদ্ভাবন, স্থানীয় ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে ভিসা জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যকে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে ধরে রাখার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাই এখন নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ।

রাসেল গ্রুপের তিন দফা প্রস্তাব সেই ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স