ঢাকা

প্রাথমিকে মৌলিক শেখায় সংকট: ই–ঈ উচ্চারণ পারে না অনেক শিক্ষার্থী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো বাংলা ভাষার মৌলিক বর্ণ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। অনেক শিক্ষার্থী ই, ঈ, উ, ঊ, স, শ ও ঙ বর্ণের উচ্চারণে ভুল করে, যুক্তবর্ণ পড়তে গিয়ে হোঁচট খায়, এমনকি চার-পাঁচ অক্ষরের বাংলা শব্দও সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষা ও গণিতে তাদের দক্ষতার ঘাটতিও স্পষ্ট। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী ছোট ছোট গুণ-ভাগ করতে পারে না, স্থানীয় মান (Place Value) সম্পর্কে ধারণা দুর্বল এবং পঞ্চম শ্রেণির অনেকে ইংরেজি বইয়ের সাধারণ নির্দেশনাও ঠিকভাবে পড়তে পারে না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট পরিচালিত সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত জুন মাসে ঢাকা মহানগর, ঢাকা জেলা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের প্রায় ২ হাজার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন বলছে, পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মাত্র ২৫৪টি বিদ্যালয় (প্রায় ১২ শতাংশ) শিক্ষার মানের বিচারে সর্বোচ্চ ‘এ’ শ্রেণিতে স্থান পেয়েছে। বাকি অধিকাংশ বিদ্যালয় গড়পড়তা বা নিম্নমানের পর্যায়ে রয়েছে। ১ হাজার ৯৫টি বিদ্যালয় (৫২ শতাংশ) ‘বি’ শ্রেণিতে এবং ৭৪৯টি বিদ্যালয় (৩৬ শতাংশ) ‘সি’ শ্রেণিতে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো বিদ্যালয়ের ৮০ শতাংশ বা তার বেশি শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত শিখনদক্ষতা অর্জন করলে সেটিকে ‘এ’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। ৬১ থেকে ৭৯ শতাংশ হলে ‘বি’ এবং ৬০ শতাংশ বা তার নিচে হলে ‘সি’ শ্রেণিতে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের সংকটের নতুন প্রমাণ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। নতুন এই সরকারি মূল্যায়ন সেই সংকটকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও বাস্তবে বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের অভাব এখনো প্রকট। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরে পড়া, লেখা ও গণনার মৌলিক দক্ষতা দুর্বল থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা এমনকি কর্মজীবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবেই এই পরিদর্শন পরিচালনা করা হয়েছে।

বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবদুল হালিম ভূঞা বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কোথায় কেমন শিখনদক্ষতা

পরিদর্শনের সময় প্রথম শ্রেণির বাংলা, দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা ও গণিত, তৃতীয় শ্রেণির বাংলা, চতুর্থ শ্রেণির গণিত এবং পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়ন করা হয়।

ঢাকা মহানগর

ঢাকার ৩৪১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে—

৪৮টি ‘এ’ শ্রেণির
১৭৭টি ‘বি’ শ্রেণির
১১৬টি ‘সি’ শ্রেণির

এখানে বাংলায় দক্ষতা অর্জনের হার ৭১ শতাংশ, ইংরেজিতে ৬২ শতাংশ এবং গণিতে ৬৩ শতাংশ। তিন বিষয়ে গড় দক্ষতা অর্জনের হার ৬৬ শতাংশ।

ঢাকা জেলা

সাভার, কেরানীগঞ্জ, দোহার, ধামরাই ও নবাবগঞ্জের প্রায় ৬০০ বিদ্যালয়ে—

বাংলায় দক্ষতা ৬৭ শতাংশ
ইংরেজিতে ৬০ শতাংশ
গণিতে ৬২ শতাংশ
নারায়ণগঞ্জ

৫৪৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে—

বাংলায় দক্ষতা ৬২ শতাংশ
ইংরেজিতে ৫৭ শতাংশ
গণিতে ৫৯ শতাংশ

চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল চিত্র দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জে।

মুন্সিগঞ্জ

৬১১টি বিদ্যালয়ে—

বাংলায় দক্ষতা ৬৯ শতাংশ
ইংরেজিতে ৬৬ শতাংশ
গণিতে ৬৩ শতাংশ

এ ছাড়া একই জেলার মধ্যেও বৈষম্য রয়েছে। যেমন, ঢাকা মহানগরের রমনা এলাকার বিদ্যালয়গুলোর ফল তুলনামূলক ভালো হলেও দোহার উপজেলার বিদ্যালয়গুলো উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

বাংলা পড়া ও উচ্চারণে বড় ঘাটতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক শিক্ষার্থী ‘ব্রহ্মপুত্র’, ‘তৃষ্ণা’-এর মতো যুক্তবর্ণযুক্ত শব্দ পড়তে পারে না। চার-পাঁচ বর্ণের সাধারণ বাংলা শব্দও অনেকের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বড় অংশ কারচিহ্ন ব্যবহারে সমস্যায় পড়ে।

বাংলা পাঠে সাবলীল শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম। পঞ্চম শ্রেণিতে পৌঁছেও অনেক শিক্ষার্থী জটিল শব্দ বা একাধিক শব্দাংশবিশিষ্ট শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে না।

ইংরেজি ও গণিতেও একই চিত্র

ইংরেজিতে পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বইয়ের সাধারণ নির্দেশনা কিংবা পরিচিত শব্দও সাবলীলভাবে পড়তে পারে না।

গণিতে দুর্বলতা আরও স্পষ্ট। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর স্থানীয় মান সম্পর্কে ধারণা দুর্বল। অনেকেই ছোট ছোট গুণ ও ভাগ করতে পারে না। হাতে রেখে বিয়োগ করার ক্ষেত্রেও অনেক বিদ্যালয়ে ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—চারটি মৌলিক গাণিতিক প্রক্রিয়াতেই ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নামতা মুখস্থ জানলেও বাস্তব সমস্যায় তা প্রয়োগ করতে পারে না।

মেয়েরা এগিয়ে, ছেলেদের উপস্থিতি কম

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ছেলেশিক্ষার্থীরা সামগ্রিকভাবে মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ছেলেদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও তুলনামূলক কম।

বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের কিছু বিদ্যালয়ে উপস্থিতি অত্যন্ত কম। কোনো কোনো শ্রেণিতে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকার ঘটনাও পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান হয়—এমন কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়ার প্রবণতা বেশি এবং অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসেরও অভাব রয়েছে।

দুর্বলতার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতা

পরিদর্শনের আওতায় থাকা হাজারীবাগ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ ছায়িদ উল্লা বলেন, প্রতিটি শ্রেণিতে অন্তত চার থেকে পাঁচজন অত্যন্ত দুর্বল শিক্ষার্থী রয়েছে।

তার ভাষ্য, এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার মধ্যে বড় হচ্ছে। কারও বাবা-মা সঙ্গে থাকেন না, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছে বেড়ে উঠছে, অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে রয়েছে, আবার কেউ দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগছে। এসব কারণে প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে।

তিনি মনে করেন, শিখনঘাটতি কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং কার্যকর প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।

শিক্ষকসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকটও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

বর্তমানে ৩৬ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, যা মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব পদে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ হলে সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ বেড়ে ৩৮ হাজারের বেশি হবে বলে মন্ত্রণালয়ের হিসাব। যদিও ইতোমধ্যে ১৪ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।

সংকট উত্তরণে যেসব সুপারিশ

পরিদর্শন প্রতিবেদনে শিক্ষার মান উন্নয়নে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

বাংলা ও ইংরেজিতে সম্পূরক পাঠ্যসামগ্রী ব্যবহার।
প্রতি মাসে ‘বর্ণ উৎসব’ আয়োজন।
বর্ণ কার্ড ব্যবহার ও যুক্তবর্ণ ভেঙে শেখানো।
বাড়ির কাজ হিসেবে গল্পের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
দিনের শুরুতেই গণিত ও ইংরেজি ক্লাস নেওয়া।
‘অ্যাবাকাস মডেল’ ব্যবহার করে স্থানীয় মান শেখানো।
যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শেখানো।
নিয়মিত নামতা অনুশীলন ও দলভিত্তিক শিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা।
প্রতিটি বিদ্যালয়ের দুই থেকে তিনজন শিক্ষককে গণিত অলিম্পিয়াডভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া।
শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও শ্রেণিকক্ষ প্রস্তুতি বাড়ানো।
শিক্ষকস্বল্পতা সমন্বয় করা।
কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ।
কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয় একীভূত করা।
শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।
শিক্ষাবিদের মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিখনফলের ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

তার মতে, অনেক শিক্ষক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করেন। আবার বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতিও রয়েছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে কাঙ্ক্ষিত শেখা নিশ্চিত হয় না। এক শ্রেণির শিখনঘাটতি পরবর্তী শ্রেণিতে বহন হওয়ায় সমস্যা আরও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী কোচিং বা অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পায় না, তারা ক্রমেই আরও পিছিয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক স্তরে পড়া, লেখা ও গণনার মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত না করতে পারলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে সেই ঘাটতি পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কার্যকর মূল্যায়ন এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করার বিকল্প নেই।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স