ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অনশনে থাকা লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুককে অনশনের ২১তম দিনে জোরপূর্বক ধরনাস্থল থেকে সরিয়ে রাজধানী দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করেছে দিল্লি পুলিশ। শনিবার ভোরে যন্তর মন্তরে পরিচালিত এই অভিযানের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক গত ২০ দিন ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন চালিয়ে আসছিলেন। সোমবার ঘোষিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তার দুই দিন আগেই পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, সরকার সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে আন্দোলনের গতি থামাতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও দিল্লি পুলিশের দাবি, হাইকোর্টের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর জীবন রক্ষার স্বার্থেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ভোরের অভিযানে ধরনাস্থল থেকে সরানো হয় ওয়াংচুককে
শনিবার ভোরে যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থলে হঠাৎ করেই সাদা পোশাকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য প্রবেশ করেন।
ঘটনাস্থলে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের হাতে সাদা চাদর ছিল। তখন সোনম ওয়াংচুক ধরনামঞ্চে বিছানায় বসে ছিলেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা পুলিশকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ দ্রুত তাঁকে ঘিরে ফেলে।
এরপর সাদা চাদর দিয়ে তাঁকে আড়াল করে বিছানাসহ ধরনামঞ্চ থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো অভিযান শেষ করতে সময় লাগে প্রায় ১০ মিনিট।
এরপর তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
‘সোমবার পর্যন্ত অবশ্যই বেঁচে থাকব’
হাসপাতালে নেওয়ার মাত্র এক দিন আগে শুক্রবার সোনম ওয়াংচুক বলেছিলেন, শারীরিকভাবে দুর্বল লাগলেও মানসিকভাবে তিনি দৃঢ় আছেন।
তিনি জানিয়েছিলেন, অন্তত সোমবার পর্যন্ত সুস্থ থাকার আশা করছেন এবং সেদিনের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পুলিশের ব্যাখ্যা
দিল্লি পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের দাবি, দীর্ঘ অনশনের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আন্দোলনকারীরা পুলিশকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় সামান্য ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশ সংযতভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
পুলিশ আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে ধরনাস্থল ত্যাগ করার আহ্বানও জানিয়েছে।
নতুন অনশন শুরুর ঘোষণা
ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার পর আন্দোলন পরিচালনাকারী ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংগঠনের নেতা অভিজিৎ দিপকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেছেন।
একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, সোনম ওয়াংচুককে জোর করে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এর আগে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁকে মারধর করেছে এবং আটকে রেখেছে। যদিও দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কী নিয়ে আন্দোলন
ভারতের জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই–সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় এক মাস ধরে যন্তর মন্তরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে শিক্ষার্থীরা।
সিজেপির ব্যানারে পরিচালিত এই আন্দোলনের মূল দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।
গত ২৮ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পরিবেশকর্মী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
হাইকোর্টের নির্দেশের পর তৎপরতা
গত বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্ট এক মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেয়, সোনম ওয়াংচুকের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।
আদালত নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশও দেয়।
এই নির্দেশের পরই সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে এবং শনিবার ভোরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরিবারের উদ্বেগ
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো হাসপাতালে পৌঁছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দেন।
তিনি জানান, পরিবারের অনুমতি এবং গত ২০ দিন ধরে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া যেন তাঁর চিকিৎসা বা পরিচর্যার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়।
বিশেষ করে তাঁকে জোর করে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা না করারও আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও সরকারের কোনো প্রতিনিধি তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসেননি।
একইভাবে, ২০ দিনের বেশি সময় ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়ার পরও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে সরকার কোনো সংলাপের উদ্যোগ নেয়নি।
তাদের দাবি, সংসদ অধিবেশন ঘনিয়ে আসার পরই সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছে।
কংগ্রেসের সমালোচনা
এ ঘটনার পর বিরোধী কংগ্রেসও সরকারের সমালোচনায় সরব হয়েছে।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেনুগোপাল এক বিবৃতিতে সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।
রাজ্যসভার সদস্য ও দলের মুখপাত্র পবন খেরা ধরনাস্থলে গিয়ে সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন এবং অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি ইতিবাচক সাড়া প্রত্যাশা করা কঠিন এবং এ অবস্থায় জীবন ঝুঁকিতে ফেলার প্রয়োজন নেই।
সোনিয়া গান্ধীর স্মরণ
শুক্রবার কংগ্রেস সংসদীয় দলের বৈঠকে সোনিয়া গান্ধী অতীতের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালে সোনম ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংগিয়াল লাদাখিদের তফসিলি জনজাতির মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে অনশন করেছিলেন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
পরে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেন।
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
সরকারের এই পদক্ষেপের পরও আন্দোলনকারীরা পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দেননি।
সিজেপি জানিয়েছে, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী সোমবার ‘চলো সংসদ’ অভিযান অনুষ্ঠিত হবে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার হাইকোর্টের নির্দেশকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সোনম ওয়াংচুককে সরিয়ে সংসদ অভিযানের গতি থামানোর চেষ্টা করেছে।
তবে তাদের দাবি, আন্দোলনের নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।