ঢাকা

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সহযোগিতায় নতুন সমীকরণ, পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে কুয়েত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জ্বালানি সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে সামনে রেখে কুয়েতের সঙ্গে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা করছে পাকিস্তান। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতাকে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের মতো বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করতে আগ্রহী।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কারণে এ আলোচনা অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই আলোচনা

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

গত সোমবার ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবে হামলা চালানোর পর পাকিস্তান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, সৌদি আরবের ওপর যেকোনো হামলাকে তারা নিজেদের নিরাপত্তার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করবে।

একই সময়ে চলতি বছরে কয়েক দফা হামলার শিকার হয়েছে কুয়েতও। ফলে দেশটি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে পাকিস্তান যদি কুয়েতের সঙ্গে সৌদি আরবের আদলে বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সীমিত চুক্তি থেকে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা সহযোগিতার পথে?

২০২৩ সাল থেকে পাকিস্তান ও কুয়েতের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়াকেন্দ্রিক একটি সীমিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর রয়েছে।

কিন্তু বর্তমান আলোচনায় কুয়েত পাকিস্তানের কাছ থেকে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতা চাইছে।

আলোচনার বিষয়ে অবগত পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত সহযোগিতার আওতায় থাকতে পারে—

হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন,
যুদ্ধবিমান সহযোগিতা,
ড্রোন প্রযুক্তি,
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা,
সামরিক প্রশিক্ষণ,
অন্যান্য প্রতিরক্ষা সহায়তা।

তবে পাকিস্তান সরকার এখনো এ ধরনের বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত কি না, তা নিশ্চিত নয়।

কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক কয়েক দশকের ঐতিহাসিক মিত্রতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এবং সেটি বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।

‘সব ধরনের সামরিক সহযোগিতাই চাইছে কুয়েত’

পাকিস্তানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, কুয়েতের চাওয়ার তালিকায় প্রায় সব ধরনের সামরিক সহযোগিতাই রয়েছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমানে যুদ্ধ পরিচালনার উদ্দেশ্যে সেনা পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা পাকিস্তানের নেই।

তার ভাষায়,

“একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ মুহূর্তে যুদ্ধের জন্য সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি না এবং করতে পারি না।”

মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

তবে সূত্রটি বলেছে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত এটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আনুষ্ঠানিক মন্তব্য মেলেনি

রয়টার্স এ বিষয়ে পাকিস্তানের চারটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে।

তবে আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা (আইএসপিআর) এবং কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য চাইলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয়, পরিপূরক নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো

গত এক বছরে পাকিস্তান ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ নতুন ধরনের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর নিরাপত্তার জন্য পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না। বরং তারা বিকল্প বা পরিপূরক নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে।

পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী, নিজস্ব যুদ্ধবিমান উৎপাদনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা দেশটিকে এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদারে পরিণত করেছে।

কুয়েতের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র বলেছে, পাকিস্তানকে তারা নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

সূত্রটির ভাষ্য,

“সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। দেশটির সামরিক খাতে ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে। একই সঙ্গে সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই অন্য অনেক বিকল্পের তুলনায় পাকিস্তানকে অংশীদার করা রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক কম স্পর্শকাতর।”

নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোটের সম্ভাবনা

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি নতুন বহুপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করছে।

এটি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির বাইরে পৃথক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ ছাড়া—

বাহরাইন একই ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
জর্ডান পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক প্রশিক্ষণবিষয়ক চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।

এগুলো বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’ মডেলের আলোচনা

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান সরকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, কুয়েতের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।

এটি পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বৃহত্তর তেল ও জ্বালানির মজুত বৃদ্ধির পরিকল্পনার অংশ।

পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, কুয়েত পাকিস্তানে শুল্ক-সুবিধাসহ জ্বালানি সংরক্ষণাগার নির্মাণের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।

এ উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ডিজেল সরবরাহ চুক্তির ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া হতে পারে।

দুটি সূত্রের মতে, জ্বালানি খাতে এ ধরনের সহযোগিতা পাকিস্তানকে আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।

তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমে এলে এ আলোচনা আরও গতি পাবে।

সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি-এর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল মনে করেন, পাকিস্তানের এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অতিরিক্ত সামরিক প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতে ইসলামাবাদের জন্য নতুন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, পাকিস্তানকে সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির দিকগুলো গভীরভাবে মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তার ভাষায়, “পাকিস্তানকে বুঝে-শুনে এগোতে হবে। অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন থাকতে হবে।”

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স