ঢাকা

দ্য গার্ডিয়ানের সাক্ষাৎকারে আইসিসি প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর বক্তব্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালরের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে দুই নারী অভিযোগকারীর টেলিভিশন সাক্ষাৎকার। প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসে অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন আইসিসির এক নারী কর্মকর্তা, যার নামের প্রথম অংশ ‘সারাহ’। আরেক অভিযোগকারী ‘প্যাট্রিসিয়া’ ছদ্মনামে মুখ ঢেকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ান–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ান আমানপোরকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকার এমন এক সময় প্রকাশিত হয়েছে, যখন আগামী সপ্তাহেই করিম খানকে পদ থেকে অপসারণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলো ভোট দিতে যাচ্ছে। ফলে অভিযোগগুলোর সময় নির্বাচন নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

প্রথমবার প্রকাশ্যে অভিযোগকারীর বক্তব্য

সারাহ পেশায় একজন আইনজীবী এবং ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইসিসিতে করিম খানের বিশেষ সহকারী হিসেবে সরাসরি তাঁর অধীনে কাজ করেছেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, করিম খানের আচরণ ছিল ধাপে ধাপে তাঁর ব্যক্তিগত সীমারেখা ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা।

সারাহর ভাষ্য, শুরুতে আচরণগুলো তুলনামূলক সূক্ষ্ম হলেও সময়ের সঙ্গে তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, করিম খান শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা করতেন।

হোটেল কক্ষে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের অভিযোগ

সাক্ষাৎকারে সারাহ একটি নির্দিষ্ট ঘটনারও বর্ণনা দেন।

তার দাবি, কলম্বিয়ায় একটি সরকারি সফরের সময় করিম খান তাঁর হোটেল কক্ষে প্রবেশ করেন। সে সময় তিনি ঘুমানোর ভান করে শুয়ে ছিলেন।

সারাহর অভিযোগ, ওই অবস্থায় করিম খান তাঁর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেন।

তবে করিম খান শুরু থেকেই এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছেন।

দ্বিতীয় অভিযোগকারীরও একই ধরনের দাবি

সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দ্বিতীয় অভিযোগকারী ‘প্যাট্রিসিয়া’ ছদ্মনামে বক্তব্য দেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর পরিচয় গোপন রাখা হয় এবং সাক্ষাৎকারে মুখও আড়াল করা হয়।

তিনি এর আগেও ২০২৪ সালে দ্য গার্ডিয়ান–এর কাছে একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন।

প্যাট্রিসিয়ার দাবি, ২০০৯ সালে করিম খানের সঙ্গে ইন্টার্নশিপের সময় তাঁকে প্রায়ই তাঁর বাসায় গিয়ে কাজ করতে হতো।

সেখানে গেলেই করিম খান তাঁর প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

করিম খানের আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া

করিম খানের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন তাঁর আইনজীবীদের একজন সারেতা আশরাফ।

তিনি বলেন, দুই নারীর আনা অভিযোগ নতুন নয় এবং করিম খান শুরু থেকেই সেগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছেন।

তার ভাষ্য, সিএনএনের অনুষ্ঠানে যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে, প্রকৃত তথ্য ও প্রমাণ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কেন আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা হলো।

সারেতা আশরাফ জানান, অভিযোগসংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য তথ্য ইতোমধ্যে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ ভোটের আগে বাড়ল চাপ

করিম খান এবং আইসিসি—উভয়ের জন্যই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে সামনে এসেছে।

আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আইসিসির ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা নজিরবিহীন এক ভোটে সিদ্ধান্ত নেবেন, করিম খান তাঁর পদে বহাল থাকবেন কি না।

এর আগে গত মাসে আইসিসির গভর্নিং বডি সারাহর অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে বলে মত দেয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো হয়।

‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’—দাবি করিম খানের পক্ষের

করিম খানের আইনজীবীরা পুরো শাস্তিমূলক প্রক্রিয়াকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

তাদের বক্তব্য, অভিযোগ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নিয়মবহির্ভূত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং এটি একটি পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের সঙ্গে যোগসূত্রের দাবি

করিম খানের প্রতিনিধিরা এর আগেও দাবি করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।

তাদের বক্তব্য, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করার পর থেকেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা শুরু হয়।

তবে দ্য গার্ডিয়ান–এর হাতে আসা তদন্তসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, সারাহকে কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা বা তৃতীয় কোনো পক্ষ ব্যবহার করেছে—এমন দাবির পক্ষে তদন্তে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

‘অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়’

মালয়েশিয়ার নাগরিক সারাহ এখনো আইসিসিতে কর্মরত রয়েছেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যদি তিনি কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করতেন বা এ ধরনের সন্দেহেরও ভিত্তি থাকত, তাহলে তাঁকে অনেক আগেই চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো।

তিনি বলেন, তাঁর অভিযোগের একমাত্র কারণ তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।

সারাহর ভাষায়, তিনি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই অভিযোগ করেছেন।

এখনও অভিযোগ অস্বীকার করিম খান

২০২১ সালে নয় বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নির্বাচিত হন করিম খান। তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন বিভাগ যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের তদন্ত ও বিচার পরিচালনা করে।

বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অভিযোগগুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছেন।

অন্যদিকে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আসন্ন ভোটে তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং রাজনৈতিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ও নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স