ঢাকা

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন প্রস্তাব, আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে ইসিতে জামায়াত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় দলটির কোনো নেতা বা সক্রিয় কর্মী যাতে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দলটি চায়, সরকারের মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আচরণবিধিতে যুক্ত করা হোক।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আচরণবিধির ওপর মতামত জানিয়ে এ সুপারিশ করেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

আচরণবিধিতে নতুন বিধান সংযোজনের দাবি

জামায়াতের প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

দলটির দাবি, বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলটির নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত নয়।

জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের শনিবার এ বিষয়ে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার কথা নয়।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো চিঠিতে শুধু এই বিষয়টিই নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে।

তার ভাষায়, “আশা করা যায়, নির্বাচন কমিশন আমাদের প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।”

আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন বিতর্ক

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারায়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাদের বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

এরপর নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করলে দলটি গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

তবে সরকার চলতি বছরের অক্টোবরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ধারাবাহিকতা শুরু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করায় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে নয়, নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, দলীয় প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগের বর্তমান বা সাবেক নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না।

সরকার ও ইসির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

এর আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিচ্ছে ইসি

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা নেই।

এর পরিবর্তে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খসড়া আচরণবিধি প্রস্তুত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে লিখিত মতামত চাওয়া হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী সেই আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের বিস্তারিত প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে।

আরও যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত

আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিধান যুক্ত করার পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থায় আরও কয়েকটি পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে দলটি।

জামায়াতের প্রস্তাবগুলো হলো—

নির্বাচনী প্রচারণায় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।
স্থানীয় সরকার প্রশাসনে নিয়োজিত প্রশাসক বা বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা।
নির্বাচনী প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা।
নির্বাচন কমিশনের প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতার পাশাপাশি প্রার্থীদের আপিল করার সুযোগ আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা।
নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিসে এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান সংযোজন করা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ এবং সংবাদ সংগ্রহের অধিকার সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা।
নারী সদস্য ও জেলা পরিষদ নির্বাচনেও পরিবর্তনের সুপারিশ

জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় সরকার কাঠামোতেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে।

এর একটি হলো, ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী সদস্যপদ ব্যবস্থা বাতিল করে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা।

অন্য প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে কারা ভোটার হবেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক

জামায়াতের এই প্রস্তাব স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও নির্দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে দলটির বর্তমান বা সাবেক নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো আইনি ব্যাখ্যা বা সরকারি সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি।

এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত আচরণবিধি প্রণয়ন করবে। সেই বিধিমালায় জামায়াতে ইসলামীর এই প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয় কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স