যুক্তরাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের প্রাক্কালে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী সোমবার তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। এর আগে তাঁর নতুন মন্ত্রিসভায় কারা জায়গা পাচ্ছেন, তা নিয়ে ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।
যদিও বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, তিনি এখনো মন্ত্রিসভার সদস্যদের চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণের কাজ শেষ করেননি। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন সরকারের কাঠামো প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং দায়িত্ব গ্রহণের দিনই মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে।
দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মন্ত্রিসভা ঘোষণা করতে চান না বার্নহ্যাম
মন্ত্রিসভা নিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের আগেই মন্ত্রিসভা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু করলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
“আপনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই যদি মন্ত্রিসভায় রদবদল শুরু করে দেন, তাহলে তা কিছুটা অগ্রিম হয়ে যাবে। আমার মনে হয়, এতে পুরোপুরি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।”
তিনি জানান, মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং সোমবার দায়িত্ব নেওয়ার পরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে কারা এগিয়ে
যদিও নতুন মন্ত্রিসভার তালিকা এখনো প্রকাশ হয়নি, তবু ব্রিটিশ রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিশেষ করে বর্তমান অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে নতুন চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার (অর্থমন্ত্রী) কে হচ্ছেন, তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদে এগিয়ে রয়েছেন—
এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড
শাবানা মাহমুদ
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত দেননি বার্নহ্যাম।
সরকারের অগ্রাধিকার হবে সমাজসেবা সংস্কার
দলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর দেওয়া প্রথম ভাষণেই নিজের সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের রূপরেখা তুলে ধরেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
তিনি জানান, ক্ষমতায় এলে জাতীয় সমাজসেবা (সোশ্যাল কেয়ার) ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার, জনসেবা উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন খাতে সংস্কারেরও ইঙ্গিত দেন তিনি।
‘জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতায় আসছেন’—ফারাজ
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনীতিক নাইজেল ফারাজ।
তিনি অভিযোগ করেন, বার্নহ্যাম জনগণের প্রত্যক্ষ রায় বা নতুন নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
ফারাজ বলেন,
“অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কোনো ধরনের গণরায় (ম্যান্ডেট) ছাড়াই ক্ষমতায় আসছেন।”
তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রীকে যত দ্রুত সম্ভব সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের ভোটের মাধ্যমেই নতুন সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করা উচিত।
সহযোগিতার বার্তা লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের
অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এডওয়ার্ড ডেভি বার্নহ্যামকে অভিনন্দন জানিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী চাইলে সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা করতে পারবেন।
তার ভাষায়,
“আমার দরজা খোলা আছে।”
এডওয়ার্ড ডেভি বলেন, তার দল বিশেষ করে—
পানি খাতের সংস্কার,
জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) শক্তিশালী করা,
সমাজসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন,
পরিবারে স্বজনদের সেবাযত্নে নিয়োজিত ব্যক্তিদের (ফ্যামিলি কেয়ারার) জন্য আরও সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নতুন সরকারের কাছ থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছে।
দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে বার্নহ্যামের রাজনৈতিক অবস্থান
মাত্র এক মাস আগে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আবারও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ফিরে আসেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
এরপর চলতি সপ্তাহে লেবার পার্টির ৩৭৯ জন সংসদ সদস্য (এমপি) এবং দল-সংশ্লিষ্ট ১১টি ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়ার মাধ্যমে তিনি দলীয় নেতৃত্বে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেন।
এর ফলে লেবার পার্টির নেতৃত্বে তিনি একমাত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
সোমবারই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী সোমবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।
এরপর রাজা তৃতীয় চার্লস অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবেন।
বার্নহ্যাম সেই আমন্ত্রণ গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন এবং ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে তাঁর নতুন সরকারের কার্যক্রম শুরু করবেন।
‘সোমবারই সব জানা যাবে’
মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্যদের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, তিনি এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তিনি বলেন,
“আমি এ–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত করছি। খুব শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাব এবং সোমবার সেগুলো ঘোষণা করব।”
ফলে যুক্তরাজ্যের নতুন সরকারের নেতৃত্বে কারা থাকবেন এবং কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কার হাতে যাবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়ার জন্য এখন অপেক্ষা সোমবার পর্যন্ত।