উচ্চশিক্ষা এখন আর শুধু শ্রেণিকক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক সামার স্কুল, গবেষণা কর্মশালা, একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান, গবেষণা দক্ষতা ও বৈশ্বিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা আন্তর্জাতিক গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এসব কর্মসূচি ভবিষ্যতের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি চীনের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটির (Sun Yat-sen University) স্কুল অব মেরিন সায়েন্সেস আয়োজিত ‘মেরিন সামার স্কুল ২০২৬’-এ অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গবেষক ও শিক্ষক মো. আবু কাওসার বলেছেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সামার স্কুল, গবেষণা কর্মশালা এবং একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচিতে আরও বেশি অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে বিশ্বমানের গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক নেটওয়ার্কও গড়ে ওঠে।
বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ
গত ১২ থেকে ১৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত চীনের জুহাই ক্যাম্পাসে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় মেরিন সামার স্কুল ২০২৬। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন।
টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬ অনুযায়ী, সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটি বিশ্বের ২০১–২৫০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে THE এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান যৌথভাবে ৪৭তম।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশেষ করে সমুদ্রবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, সামুদ্রিক প্রযুক্তি এবং উপকূলীয় গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত।
আধুনিক গবেষণার নানা বিষয় নিয়ে পাঠদান
সামার স্কুলে অংশগ্রহণকারীরা সমুদ্রবিজ্ঞান ও জলবায়ুবিষয়ক আধুনিক গবেষণার বিভিন্ন বিষয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান।
আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—
সামুদ্রিক বিজ্ঞান (Marine Science)
উপকূলীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা
জলবায়ু পরিবর্তন
ব্লু কার্বন গবেষণা
ওশান ডিএনএ
মেরিন জিওলজি
সেডিমেন্ট ডাইনামিক্স
মহাসাগরীয় পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার
চীন, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকেরা এসব বিষয়ে বক্তৃতা দেন।
শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক আলোচনা নয়, অংশগ্রহণকারীদের জন্য গবেষণাগার পরিদর্শন, মেরিন পপুলারাইজেশন মিউজিয়াম ভিজিট, আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার শেখা, দলীয় আলোচনা এবং গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনারও ব্যবস্থা ছিল।
লেখকের ভাষ্য, জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো বাস্তব জীবনের উদাহরণের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করায় শেখার অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে জুহাই ক্যাম্পাস
সামার স্কুলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটির জুহাই ক্যাম্পাসের পরিবেশ।
দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলে অবস্থিত এই ক্যাম্পাস সমুদ্র, পাহাড়, লেক ও সবুজ বনভূমিতে ঘেরা। পরিকল্পিত অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং আধুনিক গবেষণার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যানটিনে স্বল্পমূল্যে মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বাইসাইকেলের ব্যবহার বিশেষভাবে চোখে পড়ে।
লেখক জানান, ক্লাস শেষে বাইসাইকেলে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। লেকপাড়ের হাঁটার পথ, পাহাড় বেয়ে নেমে আসা প্রাকৃতিক ঝরনা এবং সবুজ পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন ভাবনা
চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে বলে উল্লেখ করেছেন লেখক।
তাঁর মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারের সমষ্টি নয়; বরং পুরো ক্যাম্পাসের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং গবেষণামনস্কতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যদি আরও পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিকভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে তা শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।
আন্তবিষয়ক গবেষণার গুরুত্ব
সামার স্কুল থেকে পাওয়া অন্যতম বড় শিক্ষা হিসেবে লেখক উল্লেখ করেছেন Interdisciplinary Research বা আন্তবিষয়ক গবেষণার গুরুত্ব।
বর্তমানে সমুদ্রবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, তথ্যবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং এবং পরিবেশবিজ্ঞান একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তাঁর মতে, ভবিষ্যতের গবেষকদের শুধু একটি বিষয়ে দক্ষ হলে চলবে না; বরং একাধিক শাখার জ্ঞান সমন্বয় করে নতুন গবেষণার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সামার স্কুল, কর্মশালা বা গবেষণা বিনিময় কর্মসূচির সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না।
ফলে ভালো ফলাফল অর্জন করলেও অনেকেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেন।
লেখকের মতে, বর্তমান বিশ্বে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি প্রয়োজন—
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
গবেষণার দক্ষতা
কার্যকর যোগাযোগক্ষমতা
বৈশ্বিক পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা
বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা
এ কারণে স্নাতক পর্যায় থেকেই আন্তর্জাতিক সামার স্কুল, স্প্রিং স্কুল, গবেষণা কর্মশালা এবং স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির তথ্য নিয়মিত অনুসরণ করা উচিত।
বিশেষ করে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অসংখ্য ফুল-ফান্ডেড সামার স্কুল ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর
লেখকের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে—
ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা
গবেষণাপত্র উপস্থাপনার সক্ষমতা
তথ্য বিশ্লেষণ
পরিসংখ্যান
প্রোগ্রামিং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণা সরঞ্জাম ব্যবহারে দক্ষতা
তিনি জানান, সান ইয়াত-সেন ইউনিভার্সিটির স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তাঁদের শুরু থেকেই MATLAB, Pythonসহ অন্তত দুটি প্রোগ্রামিং ভাষা বা কম্পিউটেশনাল টুল শেখানো হয়।
এ কারণে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় তারা শুরু থেকেই প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
শুধু ভালো ফলাফলই যথেষ্ট নয়
অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য কেবল অসাধারণ একাডেমিক ফলাফলই যথেষ্ট।
তবে লেখকের মতে, বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
ভালো ফলাফলের পাশাপাশি প্রয়োজন—
গবেষণার আগ্রহ
গবেষণাপত্র প্রকাশ
শেখার মানসিকতা
সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার লক্ষ্য
সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ
নেতৃত্বের দক্ষতা
আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই এসব দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ
লেখকের মতে, আন্তর্জাতিক সামার স্কুলে অংশগ্রহণ শুধু একটি সনদ অর্জনের বিষয় নয়; বরং এটি নতুন সংস্কৃতি, নতুন গবেষণাপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
বিভিন্ন দেশের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের আরও বেশি শিক্ষার্থী যদি এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে তাঁরা ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে যেমন সমৃদ্ধ হবেন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নেও ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবেন।
লেখক: মো. আবু কাওসার, পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস (চীন); সহকারী অধ্যাপক (শিক্ষা ছুটিতে), অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।