ঢাকা

ইরান নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা না চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও কার্যত দেশটির শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনায় তিনি সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে—এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস–এর এক প্রতিবেদনে দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত শনিবার ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজের মধ্যে এ ফোনালাপ হয়। এমন সময়ে এই আলোচনা হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি–সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনা বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলার বিকল্প পর্যালোচনা করছে।

তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত নির্দেশ দেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের হামলা হলে গত পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাত আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যদিও এর আগে কয়েক দফা কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে যুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমেছিল, কিন্তু আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে।

‘উত্তেজনা নয়, সংযম’—সৌদি বার্তা

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্ব সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও চেয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, রিয়াদ স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে।

আরেকটি সূত্র জানায়, মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে সরাসরি অনুরোধ করেছেন, যাতে তিনি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে—এমন সামরিক সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকেন।

তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট হাউস কিংবা ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওয়াশিংটন সফর

এই কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান।

সফরকালে তিনি প্রথমে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে সৌদি আরবের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, রিয়াদ ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষেই রয়েছে।

এরপর তাঁর সফরসূচিতে যুক্ত হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক। সূত্রগুলোর দাবি, ওই বৈঠকেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংকটই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।

হামলার হুমকি, পাল্টা জবাবের সতর্কতা

এদিকে ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন করে হামলা চালায়, তাহলে শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হওয়ায় সেখানে যেকোনো অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

যৌথ সামরিক পদক্ষেপ, আবারও শান্তির আহ্বান

চলতি সপ্তাহেই ইরাকে ইরান–সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

তবে একই সময়ে সৌদি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে চায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

সূত্রগুলোর মতে, মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক সব বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরা।

আঞ্চলিক কূটনীতি জোরদার

শুধু সৌদি আরব নয়, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও পাকিস্তানও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

শনিবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আসিম মুনির।

একই দিনে তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও পৃথকভাবে আলোচনা করেন আরাগচি।

ইরানের কঠোর সতর্কবার্তা

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপের জবাব ইরান দেবে।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, শুধু হামলাকারী দেশই নয়, এ ধরনের অভিযানে সহযোগিতা বা অংশগ্রহণকারী আঞ্চলিক দেশগুলোকেও ইরানের সশস্ত্র বাহিনী উপযুক্ত জবাব দেবে।

এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হরমুজ সংকট নিরসনে নতুন উদ্যোগ

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে শনিবার কাতারের মধ্যস্থতায় পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই বৈঠকে অংশ নেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ওমানের কর্মকর্তারা।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে তা বর্তমান সংকট নিরসনের জন্য যথেষ্ট হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও সমানভাবে জোরদার হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা শুধু ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককেই নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকেও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতায় সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাত বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। এখন নজর থাকবে, ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নেয়, নাকি কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স