ঢাকা

‘শেখ হাসিনা এলে সরাসরি ফাঁসির মঞ্চে’—মন্তব্য নাহিদ ইসলামের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলামের দেওয়া বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা যদি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন, তাহলে তাঁকে বিমানবন্দর থেকেই সরাসরি ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিচার, রাষ্ট্রসংস্কার এবং নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সোমবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে ‘শহীদ পরিবার ও আহতদের কণ্ঠে জনতার ১ দফা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বক্তব্য দেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য

বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, যদি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন এবং তাঁর ফেরার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে জনগণ তাঁকে বিমানবন্দর থেকেই ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা রাজপথ ছাড়বেন না।

নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ, এটি একটি চলমান রাজনৈতিক ও বিচারিক ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গও এতে উঠে এসেছে।

‘এক দফার লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি’

আলোচনা সভায় নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ‘এক দফা’ কেবল শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠাই ছিল আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

তাঁর দাবি, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। আংশিক পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্রসংস্কার, বিচার এবং জবাবদিহির মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো ন্যায়বিচার পাননি, আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনও সম্পন্ন হয়নি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে দলীয়করণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়ার কথা ছিল না।

সরকারের সমালোচনা

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণহত্যার বিচার, গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং আন্দোলন–সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। আহতদের জন্য ঘোষিত স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

নতুন সংবিধানের দাবি

রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল রেখে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন প্রয়োজন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে নতুন সংবিধানের দাবিতে আবারও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

‘রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং রাষ্ট্রসংস্কারের বিষয়ে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা প্রয়োজন।

অন্যথায় আন্দোলন আরও তীব্র হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদেরা কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য জীবন দেননি; তাঁরা বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

‘শহীদদের আত্মত্যাগ খাটো করার চেষ্টা চলছে’

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে বিতর্কের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগকে খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাঁর দাবি, জনগণ এখনো বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।

আখতার হোসেন: সংস্কারের প্রতিফলন রাষ্ট্রে থাকতে হবে

এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান। তবে সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জুলাই আন্দোলনের চেতনা এবং শহীদদের আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

একই সঙ্গে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার দাবি জানান।

সারজিস আলমের অভিযোগ

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জেলায় জুলাই আন্দোলনের আহতদের তালিকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

তাঁর দাবি, এতে প্রকৃত আহত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

তিনি বলেন, শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে নয়, স্বাধীন অবস্থান থেকেই তাঁদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবি অব্যাহত রাখতে হবে।

রোকেয়া বেগমের বক্তব্য

শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেন, অতীতের গুম, হত্যা ও সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার মতো জুলাই আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের বিচারেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকবে।

তিনি রাষ্ট্রসংস্কার–সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ কার্যকরের দাবি জানান।

মাহমুদা আলম মিতুর বক্তব্য

জাতীয় নারীশক্তির সদস্যসচিব ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতু বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন ছিল একটি জনকল্যাণমুখী, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

তিনি বলেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে আরও যারা বক্তব্য দেন

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জের শহীদ মো. আদিলের বাবা আবুল কালাম।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় নারীশক্তির মুখ্য সংগঠক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স