ঢাকা

তাপপ্রবাহ আর কর্মিসংকট—জাপানের নির্মাণশিল্পের সামনে দুই বড় চ্যালেঞ্জ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জাপানে গ্রীষ্মকাল এখন শুধু অস্বস্তির নয়, কর্মক্ষেত্রের জন্যও বড় ঝুঁকির সময়। জুলাই ও আগস্টে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এর সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি কুমামোতো অঞ্চলের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর উদ্ধার তৎপরতাও ব্যাহত হয়েছে এই তীব্র গরমে। হিটস্ট্রোকের ঝুঁকির কারণে বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে নির্মাণশিল্পের মতো খাতে সেই সুযোগ খুবই সীমিত।

এদিকে জলবায়ুগত ঝুঁকির পাশাপাশি জাপানের নির্মাণশিল্পকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে আরেকটি বড় সংকট—দক্ষ জনবলের ঘাটতি। ফলে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিদেশি শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখাই এখন খাতটির প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতা তুলে ধরতে সম্প্রতি জাপানের অন্যতম বৃহৎ আবাসন ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠান দাইওয়া হাউস গ্রুপ টোকিওভিত্তিক বিভিন্ন দেশের নিবন্ধিত সাংবাদিকদের ইয়োকোহামার ‘মিনাতো মিরাই–২১ সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ৫২’ নির্মাণপ্রকল্প পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে, কীভাবে তাপপ্রবাহ, শ্রমিকসংকট ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে কার্যক্রম দাইওয়া হাউসের

১৯৫৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাপানে নোবুও ইশিবাশির হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় দাইওয়া হাউস ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি লিমিটেড। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বড় নির্মাণপ্রতিষ্ঠান।

প্রায় ১৬২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইয়েন মূলধনের এই প্রতিষ্ঠানের সহযোগী কোম্পানির সংখ্যা ৭১৬টি। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের ২৭টি দেশ ও অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

একক আবাসিক ভবন, কন্ডোমিনিয়াম, বাণিজ্যিক ভবন, ডেটা সেন্টার, জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণেও প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ সুনাম রয়েছে। ফুকুশিমা ও কুমামোতো ভূমিকম্পের পর শত শত অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেছিল দাইওয়া। পরিবেশবান্ধব স্মার্ট হাউস, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং কর্মী উন্নয়নেও প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

ইয়োকোহামার মেগা প্রকল্প

ইয়োকোহামা শহরের সমন্বিত নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্মিত হচ্ছে মিনাতো মিরাই–২১ সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ৫২ প্রকল্প।

২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালে।

প্রায় ১১ হাজার ৮২০ বর্গমিটার জমির ওপর নির্মিত ভবনটির মোট ফ্লোর এরিয়া হবে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ বর্গমিটার। দুই তলা ভূগর্ভস্থ এবং ২৯ তলা ভূ-উপরিভাগ মিলিয়ে ভবনটির উচ্চতা হবে প্রায় ১৮০ মিটার।

ভূমিকম্প-সহনশীল ইস্পাত ও রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর এই ভবনে অফিস, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, জাদুঘর, রেস্তোরাঁ, গাড়ি রাখার স্থান এবং কেন্দ্রীয় তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা থাকবে।

সাংবাদিকদের প্রকল্পটি ঘুরিয়ে দেখান দাইওয়ার করপোরেট কমিউনিকেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এরিকা কুরোশিমা, প্রযুক্তি সদর দপ্তরের নিরাপত্তা সমন্বয় বিভাগের প্রধান মিহো শিমাদা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাসাতোশি নাসু।

গরম এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

প্রকল্পটিতে কয়েক শ কর্মী কাজ করছেন। তাঁদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই বিদেশি।

জাপানের গ্রীষ্মে শুধু তাপমাত্রাই নয়, আর্দ্রতাও অত্যন্ত বেশি থাকে। ফলে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না এবং শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এর ফলেই দ্রুত বাড়ে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে জাপানে এক লাখের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

একই সময়ে কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকজনিত মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৮১, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে নির্মাণশিল্পে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকে প্রতি ১৫টি মৃত্যুর মধ্যে পাঁচটিই নির্মাণ খাতের।

সরকারের নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা

এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালে সংশোধিত শিল্পনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য অধ্যাদেশ কার্যকর করেছে জাপান সরকার।

নতুন বিধান অনুযায়ী—

প্রতিটি কর্মস্থলে হিটস্ট্রোক-সংক্রান্ত জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা থাকতে হবে।
আক্রান্ত কর্মীকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকল থাকতে হবে।
সব কর্মীকে আগেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা জানাতে হবে।

এ ছাড়া নির্মাণশিল্পের জন্য আলাদা তাপপ্রবাহ মোকাবিলা সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে দেশটির ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

দাইওয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা

দাইওয়া হাউসের নিরাপত্তা সমন্বয় বিভাগের প্রধান মিহো শিমাদা জানান, সরকারি নির্দেশনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বিস্তারিত নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরি করেছে।

প্রতিদিন কাজ শুরুর আগে কর্মীদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। নিয়মিত বিরতি, পর্যাপ্ত পানি পান, কাজ শুরুর আগে শরীর ঠান্ডা রাখা এবং হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে কী করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রতিদিনই কর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য কর্মীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

তাপমাত্রা নয়, নজরে ‘ডব্লিউবিজিটি’

প্রকল্পটিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ডব্লিউবিজিটি (Wet Bulb Globe Temperature-WBGT) সূচক।

এই সূচক শুধু তাপমাত্রা নয়; আর্দ্রতা, সূর্যের বিকিরণ এবং বাতাসের তাপমাত্রা একসঙ্গে বিবেচনা করে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি নির্ধারণ করে।

ডব্লিউবিজিটি সূচক ২৮-এর বেশি হলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তাই নির্মাণস্থলের বড় ডিসপ্লেতে এই সূচক সার্বক্ষণিক প্রদর্শন করা হয় এবং সেই অনুযায়ী কর্মীদের বিরতি ও পানি পান নিশ্চিত করা হয়।

কর্মীদের জন্য শীতলীকরণ সুবিধা

তীব্র গরম মোকাবিলায় কর্মীদের দেওয়া হয়েছে ফ্যানযুক্ত বিশেষ পোশাক, যা শরীরের ঘাম দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া বিনা মূল্যে দেওয়া হয় আইস স্লারি, যা বরফের ক্ষুদ্র কণা ও ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয়ের মিশ্রণ।

নির্মাণস্থলে রয়েছে—

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিশ্রামকক্ষ,
ওয়াটার কুলার,
বরফ তৈরির যন্ত্র,
ব্যক্তিগত থার্মোসে বরফ ভরে নেওয়ার ব্যবস্থা,
এবং পোকারি সোয়েটসহ বিভিন্ন ঠান্ডা পানীয়।

হিটস্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দিলে কর্মীদের তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয় এই বিশ্রামকক্ষে।

সফরের সময় সেখানে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় দুই ভিয়েতনামী কর্মীকে। কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীরা যতক্ষণ ইচ্ছা বিশ্রাম নিতে পারেন; এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

বিদেশি কর্মীদের জন্য বহুভাষিক প্রশিক্ষণ

শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে জাপানের নির্মাণশিল্পে।

এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের কর্মীরা।

ভাষাগত সমস্যার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে কর্মীদের জন্য বহুভাষিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

জাপানি ভাষার পাশাপাশি—

ইংরেজি,
চীনা,
ভিয়েতনামি,
ইন্দোনেশীয়
এবং ফিলিপিনো ভাষায়

প্রশিক্ষণ ভিডিও তৈরি করা হয়েছে।

কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রত্যেকে নিজের ভাষায় নিরাপত্তা নির্দেশনা দেখতে পারেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও সতর্কতামূলক নির্দেশনাও বিভিন্ন ভাষায় প্রদর্শন করা হয়।

প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রমসাশ্রয়

শুধু জনবল নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে দাইওয়া।

নির্মাণস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ফেইসমা’ (FaceMa) নামের মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি।

এর মাধ্যমে—

অনুমোদনহীন ব্যক্তির প্রবেশ বন্ধ করা যায়,
দুর্ঘটনার সময় দ্রুত কর্মী শনাক্ত করা সম্ভব হয়,
এবং চাবি ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়েছে।

কে কখন কোন চাবি নিয়েছেন বা ফেরত দিয়েছেন—সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে।

কাগজবিহীন নির্মাণ ব্যবস্থাপনা

প্রতিদিনের কাজের নির্দেশনা, নিরাপত্তা ব্রিফিং, অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হচ্ছে eYACHO নামের ডিজিটাল ফিল্ড নোটবুক।

ট্যাবলেটের মাধ্যমে একই সময়ে নির্মাণস্থল, প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক অফিস এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

ফলে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত যেমন কমেছে, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণও দ্রুত হচ্ছে।

ডিজিকোর ও বিম প্রযুক্তি

এই প্রকল্পে আরও ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিকোর (DigiCor) প্রযুক্তি।

এর মাধ্যমে মাত্র একটি ট্যাপেই ডিজিটাল সাইট মার্কিং করা যায়। এতে সময় ও শ্রম দুটিই কম লাগে এবং ম্যানুয়াল মাপজোকের প্রয়োজনও অনেক কমে গেছে।

অন্যদিকে বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (BIM) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবনের ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল ব্যবহার করে কাঠামো, বৈদ্যুতিক লাইন, পাইপলাইন এবং অন্যান্য অবকাঠামোর সমন্বয় করা হচ্ছে।

এ প্রযুক্তির সাহায্যে কংক্রিট, ইস্পাতসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজনীয় পরিমাণ নির্ভুলভাবে হিসাব করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নির্মাণ ব্যয়, সময় এবং ত্রুটি—তিনটিই কমছে।

বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয়

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও শ্রমিকসংকটের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণশিল্পের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

দাইওয়া হাউসের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শুধু প্রযুক্তি নয়; কর্মীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়েই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ, বহুভাষিক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল নির্মাণ ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমসাশ্রয়ী প্রযুক্তির সমন্বিত এই মডেল বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জাপানের নির্মাণ খাতে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্যও এ ধরনের অভিজ্ঞতা মূল্যবান প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স