ঢাকা

সৈকতে ছুটি কাটাতে গিয়ে প্রাণ গেল ৭ জনের, ইউক্রেনের ড্রোন হামলার অভিযোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের কৃষ্ণসাগর উপকূলের একটি জনবহুল সমুদ্রসৈকতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তিন শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়েছেন। রাশিয়ার আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় আহতদের মধ্যে ১৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও একে অপরের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ তুলেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন।

মঙ্গলবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হামলার ভিডিও যাচাই করে দেখা গেছে, একটি ড্রোন দ্রুতগতিতে একটি খাড়া পাহাড়ের দিকে এগিয়ে এসে পাহাড়সংলগ্ন সৈকতে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের সময় সৈকতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান করছিলেন এবং ঘটনাটি অনেকেই প্রত্যক্ষ করেন।

জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে হামলা

হামলাটি হয়েছে কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত আরখিপো-ওসিপোভকা গ্রামের কাছে একটি জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতে। এলাকাটি রাশিয়ার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উষ্ণ আবহাওয়া, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এবং উন্নত পর্যটন সুবিধার কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে এখানে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে।

রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কনদ্রাতিয়েভ জানান, হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে তিনজন শিশু। আহত ৪০ জনের মধ্যে অন্তত ১৭ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ইউক্রেনকে দায়ী করল রাশিয়া

হামলার জন্য সরাসরি ইউক্রেনকে দায়ী করেছে রাশিয়া। গভর্নর কনদ্রাতিয়েভ অভিযোগ করেন, ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ইচ্ছাকৃত সন্ত্রাসী হামলা।

তবে হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দুই পক্ষই দাবি করে, তাদের হামলার লক্ষ্য কেবল সামরিক স্থাপনা।

লক্ষ্যবস্তু কি সত্যিই সৈকত ছিল?

ড্রোনটির প্রকৃত লক্ষ্যবস্তু সৈকত ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

টেলিগ্রামে পরিচালিত ইউক্রেনপন্থী কয়েকটি চ্যানেলে দাবি করা হয়েছে, রুশ ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার (ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার) কারণে ড্রোনটির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। সংকেত জ্যাম হয়ে যাওয়ায় সেটি নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে সৈকতে আছড়ে পড়ে।

এদিকে রাশিয়ার কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বিস্ফোরণের আগে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোনটিকে ভূপাতিত করার চেষ্টা করেছিল রুশ আকাশ প্রতিরক্ষাবাহিনী। সেই প্রচেষ্টার মধ্যেই ড্রোনটি সৈকতে বিধ্বস্ত হতে পারে।

জনপ্রিয় অবকাশকেন্দ্র

কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী এই সৈকত দীর্ঘদিন ধরেই রুশ নাগরিকদের অন্যতম জনপ্রিয় অবকাশযাপন কেন্দ্র।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অভ্যন্তরীণ পর্যটন বেড়েছে। ফলে গ্রীষ্ম মৌসুমে এ ধরনের সমুদ্রসৈকতে আগের তুলনায় আরও বেশি মানুষের সমাগম হচ্ছে।

রাশিয়ার ভেতরে বাড়ছে ইউক্রেনের হামলা

গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো, তেল শোধনাগার, সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার এবং বাণিজ্যিক গুদাম লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালানো হয়েছে।

ইউক্রেনের দাবি, এসব স্থাপনা রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয় এবং তাই সেগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু।

তবে এসব হামলায় একাধিকবার বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। গত সপ্তাহান্তেও রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে পৃথক হামলায় অন্তত আটজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে বেসামরিক প্রাণহানি

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এরপর আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই নিয়মিত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়ে আসছে।

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনের আবাসিক এলাকা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং নগরকেন্দ্রগুলোতে রুশ হামলায় হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সীমান্তের অনেক ভেতরে হামলার পরিধি বাড়িয়েছে, যার ফলে রাশিয়ার ভেতরেও বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বাড়ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত শনিবার রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাজধানী কিয়েভে হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত নয়জন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন।

সাম্প্রতিক এই দুই হামলা আবারও দেখিয়ে দিল, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই দুই দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে বেসামরিক জনগণও সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার সংযমের আহ্বান জানালেও পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় যুদ্ধ আরও জটিল ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স