বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি আজ মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছে। সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে কমিটির কর্মপদ্ধতি, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময়সূচি এবং জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো কীভাবে বিবেচনা করা হবে—এসব বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নির্বাচিত বিএনপি সরকার নিজস্ব সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ায় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার।
১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করে সংসদে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। তবে কী ধরনের পদ্ধতিতে কমিটি কাজ করবে, কারা এতে মতামত দেবেন কিংবা কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে—এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সংবিধানের মতো বিস্তৃত বিষয়ে কাজ হওয়ায় প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে কমিটির উল্লেখযোগ্য সময় লাগতে পারে।
প্রথম বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হবে
আজকের বৈঠকে মূলত কমিটির কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হবে।
এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—
কমিটির কার্যপদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ।
অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের কাঠামো ঠিক করা।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া নির্ধারণ।
বিদ্যমান সংবিধানের বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনার রূপরেখা।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাব এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সংস্কার অঙ্গীকার মূল্যায়নের পদ্ধতি।
সবশেষে এসব আলোচনার ভিত্তিতে একটি সুপারিশমালা প্রস্তুত করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেবে কমিটি।
সালাহউদ্দিন আহমদ যা বললেন
বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রথম বৈঠকে কমিটি নিজেদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি দলটির নিজস্ব নির্বাচনী অঙ্গীকারও রয়েছে, যেগুলো বিবেচনায় রাখা হবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
তিনি জানান, সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় সংবিধান সংশোধনী বিল প্রস্তুত করবে। পরে বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে এবং আলোচনা শেষে ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কোন কোন বিষয় পর্যালোচনা করবে কমিটি
বিশেষ কমিটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রস্তাব একসঙ্গে পর্যালোচনা করবে। এর মধ্যে রয়েছে—
বর্তমান সংবিধানের বিভিন্ন বিধান।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকার।
প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা।
এসব পর্যালোচনার ভিত্তিতে সংবিধানের কোন কোন ধারায় পরিবর্তন প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুপারিশ করবে কমিটি।
বিরোধী দলের আপত্তি
বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সরকারি দল পাঁচজন সদস্যের নাম চেয়েছিল। তবে বিরোধী দল কোনো সদস্যের নাম দেয়নি।
কমিটি গঠনের দিনই বিরোধী সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তাঁদের নীতিগত আপত্তি নেই। তবে সরকার যে পদ্ধতিতে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, সে বিষয়ে তাঁদের মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হয়েছিল সংস্কার প্রক্রিয়া
সংবিধান সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়।
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন দীর্ঘ পর্যালোচনা, অংশীজনদের মতামত এবং জনমত জরিপের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি সরকারের কাছে বিস্তারিত সুপারিশ জমা দেয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ।
জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রস্তাব
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান-সংক্রান্ত মোট ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন।
উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নির্ধারণ।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের নতুন পদ্ধতি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও ক্ষমতা-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা।
এসব বাস্তবায়িত হলে দেশের সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিএনপির ভিন্নমত
জুলাই জাতীয় সনদের সব প্রস্তাবে বিএনপি একমত ছিল না।
বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে দলটি ভিন্নমত দেয়।
জুলাই সনদে জাতীয়ভাবে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের কথা বলা হলেও বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, নিম্নকক্ষে একটি দল যে সংখ্যক আসন পাবে, সেই অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হওয়া উচিত।
গণভোট ও সংস্কার পরিষদ নিয়ে জটিলতা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
ঐকমত্য কমিশনের মূল প্রস্তাবগুলোতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ার পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল।
এ জন্য সংসদ সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছিল—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ গ্রহণে অংশ নেননি। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন আর সম্ভব হয়নি।
বিএনপির দাবি, ওই বাস্তবায়ন আদেশ আইনগতভাবে বৈধ নয় এবং পৃথক শপথেরও সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। তবে দলটি বলছে, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে তারা ভিন্নমতসহ স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
বড় প্রশ্ন কী
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের ভিত্তিতে সুপারিশ করবে, নাকি সেগুলোকে শুধু একটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও বর্তমান সংসদের রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে নতুন সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করবে।
আজকের প্রথম বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতির একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।