ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির অভিযোগ, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতি অসম্মান দেখিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে এ বক্তব্য দেওয়া হয়। পরে এ বিষয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। দলের যুগ্ম সদস্যসচিব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
‘বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি অসম্মান’
লিখিত বক্তব্যে এনসিপি দাবি করে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল।
দলটির ভাষ্য, এমন একটি সিদ্ধান্ত এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া ও জনমত অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।
‘ভারত জনগণের চেয়ে আওয়ামী লীগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে’
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি অভিযোগ করে, শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়ে ভারত আবারও প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ককে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
দলটির মতে, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু শেখ হাসিনাকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার মাধ্যমে নয়াদিল্লি সেই প্রত্যাশার বিপরীত অবস্থান নিয়েছে।
শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে এনসিপি বলেছে, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি, ন্যায়বিচারের দাবি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো প্রয়োজন।
সরকারের ভূমিকার সমালোচনা
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে সরকারের ভূমিকাও সমালোচনা করে এনসিপি।
দলটির অভিযোগ, আদালতের রায় কার্যকর করতে সরকার এখন পর্যন্ত যথেষ্ট কার্যকর, দৃশ্যমান এবং ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি।
এনসিপির মতে, বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও সক্রিয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
দলটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
‘ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসান চাই’
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি জানায়, দলটি গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং সব ধরনের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসানের পক্ষে অবস্থান করছে।
দলটির মতে, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ না থাকে।
‘গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নয়’
এনসিপি আরও বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্নকারী এবং জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত না করে তাঁদের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
দলটির মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা ছাড়া টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
দিল্লির সংবাদ সম্মেলন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করছে।
এনসিপির এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলটি ভারতের ভূমিকার সমালোচনার পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সরকারের আরও সক্রিয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক সংস্কার, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের প্রশ্নে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে।