সন্ত্রাস দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বেকারত্ব কমানো এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলাসহ কোনো ক্ষেত্রেই গত ছয় মাসে সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে দেশে বেকারত্বের সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে এবি পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর শাখা আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মজিবুর রহমান এসব কথা বলেন।
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট: জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন দলটির নেতারা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশের বেকারত্ব কমানো এবং কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের কারণে বেকারত্বের সমস্যা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর বক্তব্য, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু গত ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এতে বহু শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সংকট দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও কমবে এবং বেকারত্বের চাপ বাড়বে।
মজিবুর রহমানের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। একদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
দ্রব্যমূল্য ও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ
আলোচনা সভায় দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পণ্য ও সেবার দামের ওপর।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে একদিকে বেকারত্ব বাড়বে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যও আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়বে।
মজিবুর রহমান সতর্ক করে বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকলে এবং আয় সেই তুলনায় না বাড়লে সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি সরকারের জনসমর্থনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।
‘সরকার অজনপ্রিয় হলে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে পড়ে’
সরকারের রাজনৈতিক আচরণ নিয়েও সমালোচনা করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো সরকার যখন ক্রমে জনসমর্থন হারাতে থাকে, তখন অনেক সময় তারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
তাঁর দাবি, অজনপ্রিয় সরকার ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের দিকে যেতে পারে এবং বিরোধী মত ও সমালোচনার প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সুশাসন ও গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে আবারও গণআন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মজিবুর রহমান বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সরকারের উচিত জনজীবনের সংকট নিরসনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা।
জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের সমালোচনা
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ায় গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।
তাঁর মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বক্তব্যে অস্পষ্টতা থাকলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, সরকার যদি একদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অন্যদিকে বাস্তবে তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের কার্যক্রমের বড় ধরনের ফারাক তৈরি হবে।
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আপসের সুযোগ নেই’
সভায় সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক গোলাম ফারুকও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস, কালক্ষেপণ কিংবা রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নেই।
বর্তমান সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে, তাহলে দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গোলাম ফারুক বলেন, জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। এ বিষয়ে গড়িমসি বা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আলোচনা সভায় আরও যারা ছিলেন
এবি পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম সদস্যসচিব যায়েদ হাসান চৌধুরীর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্যসচিব সৈয়দ আবুল কাশেম এবং কেন্দ্রীয় নেতা আতাউর রহমান নূর।
সভায় এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব মো. জাবেদ ইকবাল, চট্টগ্রাম মহানগর নেতা আজগর হোসাইন, সঞ্জয় চৌধুরী, সুমন চৌধুরী, আরশাদ হোসাইন ও সোহরাব হোসাইনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, কর্মসংস্থান এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয় নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
এবি পার্টির নেতাদের বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পায়—জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ, জুলাই সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সুশাসন নিশ্চিত করা। মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এসব ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।