পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান রাজ্য সরকারের মাত্র চার মাসের শাসনেই মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, রাজ্যের মানুষ আবার তৃণমূলের দিকে ফিরছে এবং খুব শিগগিরই দলটি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ফিরে আসবে।
শুক্রবার কলকাতায় তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে এসব কথা বলেন মমতা। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের কাছে ক্যাথিড্রাল রোডে সমাবেশটির আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিজেপির অন্যায়ের জবাব এবার মানুষই দেবে। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং দলকে স্বাভাবিকভাবে সভা-সমাবেশও করতে দেওয়া হচ্ছে না।
তবে এসব বাধা সত্ত্বেও তৃণমূলের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি।
‘মানুষ এখন তৃণমূলের দিকেই ফিরছে’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে মানুষ নানা সমস্যায় পড়েছে। মাত্র চার মাসের শাসনেই মানুষ সরকারের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রত্যাশার কথাও উঠে আসে। মমতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গে আবার পরিবর্তন আসবে এবং তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।
বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, দলটির অন্যায়ের জবাব মানুষই দেবে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মমতার ভাষ্য, রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হলেও তা দলের জনভিত্তিকে দুর্বল করতে পারবে না। বরং মানুষ ধীরে ধীরে তৃণমূলের দিকে ফিরে আসছে।
‘তৃণমূল বাংলার চুরির ইতিহাস বদলে দেবে’
সমাবেশে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তৃণমূল নেত্রী।
তিনি বলেন, তৃণমূল আবার ক্ষমতায় ফিরলে বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা হবে। তাঁর দাবি, তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের ‘চুরির ইতিহাস’ বদলে দেবে এবং বিজেপির বড় ধরনের পতন ঘটবে।
মমতার বক্তব্যে আগামী দিনে তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই তৃণমূল আবার রাজ্যের ক্ষমতায় ফিরবে।
তাঁর এই বক্তব্য মূলত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করার পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ে তৃণমূলের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই দিনে পাল্টা কর্মসূচি
তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার কলকাতায় একাধিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হয়। মূল তৃণমূলের পাশাপাশি দলটির বিদ্রোহী অংশও পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে সমাবেশ করে।
অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেসও কলকাতার মহাজাতি সদনে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ফলে একই দিনে কলকাতায় ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে তৃণমূলের মূল সংগঠন, বিদ্রোহী অংশ এবং কংগ্রেস—তিন পক্ষের পৃথক কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘১০ হাজার কণ্ঠে বন্দে মাতরম’ বিজেপির কর্মসূচি
এদিকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির বাইরে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন বিজেপিও বড় সমাবেশের আয়োজন করে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এইট-বি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ‘১০ হাজার কণ্ঠে বন্দে মাতরম’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা করেন এবং জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে বিজেপির অবস্থান তুলে ধরেন।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, দীর্ঘ সময়ের বাম শাসন এবং পরবর্তী ১৫ বছরের ‘জামাতি শাসনের’ পর পশ্চিমবঙ্গে দেশপ্রেমীরা এখন দেশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানাচ্ছেন।
গেরুয়া রং নিয়ে বিরোধীদের কটাক্ষেরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, গেরুয়া রং নিয়ে কটাক্ষ করা হলেও স্বামী বিবেকানন্দও গেরুয়া পোশাক পরতেন।
যাদবপুরের ‘আজাদি’ স্লোগান নিয়ে আক্রমণ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠা ‘আজাদি’ স্লোগান নিয়েও কঠোর অবস্থান জানান শুভেন্দু অধিকারী।
স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসুসহ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর আবার ‘আজাদি’র দাবি কেন উঠবে।
তিনি ‘আজাদি’ স্লোগানের সমালোচনা করে বলেন, দেশ স্বাধীন করার জন্য ক্ষুদিরাম বসুসহ অসংখ্য স্বাধীনতাসংগ্রামী আত্মত্যাগ করেছেন। এরপরও কেউ কাশ্মীর বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ‘আজাদি’র স্লোগান দিলে তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
‘হয় ওরা থাকবে, নয়তো আমরা’
অনুষ্ঠানে বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এদের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। হয় ওরা থাকবে, নয়তো আমরা থাকব।’
এ সময় তিনি প্রয়োজনে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর বা পিওকে দখলের কথাও বলেন।
তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদ, কাশ্মীর ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মতো বিষয়ও বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে আসে।
যাদবপুরের হোস্টেল নিয়েও প্রশ্ন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস নিয়েও কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলগুলো কেন সাবেক শিক্ষার্থীদের দখলে রয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রভাব, ছাত্রাবাসের নিয়ন্ত্রণ এবং ‘আজাদি’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে এসব কর্মকাণ্ডকে দেশবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হলেও বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।
শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য স্পষ্ট করে বলেন, দেশবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁদের রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।
মুখোমুখি তৃণমূল-বিজেপি
শুক্রবার কলকাতার দুটি পৃথক কর্মসূচিতে তৃণমূল ও বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ ঘটছে এবং তৃণমূল খুব শিগগিরই ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অন্যদিকে বিজেপির কর্মসূচিতে শুভেন্দু অধিকারী দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ এবং ‘দেশবিরোধী’ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিপরীতে বিজেপি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্ররাজনীতি এবং জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছে।
ফলে ছাত্রসংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচি শুধু দলীয় সাংগঠনিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়েরও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। একদিকে তৃণমূলের ক্ষমতায় ফেরার প্রত্যয়, অন্যদিকে বিজেপির জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বক্তব্য—দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান রাজ্যের আগামী দিনের রাজনীতিতে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।