জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসেবে না দেখে তা সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত। বিএনপি সমালোচনাকে ভিন্নভাবে দেখায় এবং এ কারণে দলটি ধীরে ধীরে ‘লাইনচ্যুত’ হয়ে ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতা অব্যাহত থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে চাঁদপুর প্রেসক্লাবে এনসিপির সাংগঠনিক সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সারজিস আলম এসব কথা বলেন।
‘সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসেবে দেখছে বিএনপি’
বিএনপির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সারজিস আলম বলেন, তাঁরা যখন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন, তখন বিএনপির নেতারা অনেক সময় সেটিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
তাঁর ভাষায়, সমালোচনার এই বিষয়টি সঠিকভাবে না বোঝার কারণে বিএনপি ধীরে ধীরে ‘লাইনচ্যুত’ হচ্ছে এবং ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু বিএনপির জন্য নয়, দেশের জন্যও ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সারজিস বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির উচিত গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করা এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা। বিরোধী মতকে শত্রুতা বা প্রতিপক্ষতা হিসেবে দেখলে রাজনৈতিক ভুল সংশোধনের সুযোগ কমে যায় বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
তিনি বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক দলকে অন্ধভাবে বিরোধিতা করা নয়। বরং জনগণের স্বার্থে সরকারের কার্যক্রমের ঘাটতি বা ব্যর্থতা তুলে ধরা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো।
হত্যা-ধর্ষণের বিচার নিশ্চিত করার দাবি
সারজিস আলম বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হত্যা, ধর্ষণসহ সব ধরনের গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সারা দেশে সংঘটিত হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তাঁর মতে, অপরাধ সংঘটনের পর যদি অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশা তৈরি হবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের মধ্যেও আইনের প্রতি ভয় কমে যেতে পারে।
রংপুরে চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ
সম্প্রতি রংপুরে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনার উল্লেখ করে সারজিস আলম বলেন, ঘটনাটি একজন নাগরিক হিসেবে তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মনেও গভীর আঘাত তৈরি করেছে। অথচ যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেপ্তারে সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
সারজিসের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা।
তিনি বলেন, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
রংপুরের হত্যাকাণ্ডসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন সারজিস আলম।
তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি সরাসরি উত্তর দিতে পারছেন না। বরং প্রশ্নের প্রসঙ্গ এড়িয়ে অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলছেন।
সারজিস বলেন, কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে প্রশ্নকারীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে বলেও তাঁরা লক্ষ্য করছেন। তাঁর অভিযোগ, শাহবাগ বা পল্টনের প্রসঙ্গ টেনে মূল প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের উদ্বেগের জবাব সরকারের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে পাওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিতর্কে না গিয়ে অপরাধ দমন ও বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখাতে হবে।
‘ওসমান হাদির হত্যার সব ভিডিও-ছবি আছে’
সারজিস আলম ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার মতো ভিডিও ও ছবি রয়েছে। এমনকি ভারতে একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে দেশে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু ‘আনা হচ্ছে’, ‘নিয়ে আসছি’ বা ‘প্রক্রিয়া চলছে’—এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সারজিস।
তাঁর প্রশ্ন, যদি অপরাধীদের শনাক্ত করার মতো তথ্য ও প্রমাণ থাকে, তাহলে তাঁদের বিচারের আওতায় আনতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোথায়?
সারজিস বলেন, সংসদে বা জনসমক্ষে শুধু প্রক্রিয়া চলার কথা বললে মানুষের আস্থা ফিরবে না। জনগণ এখন বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়।
‘বিচার নিশ্চিত না হলে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক হবে না’
হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা চলতে থাকলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না বলে সতর্ক করেন সারজিস আলম।
তিনি বলেন, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। অপরাধীরা যদি মনে করে তারা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে, তাহলে আইন ভাঙার প্রবণতা আরও বাড়বে।
তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ধরনের গাফিলতি বা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই।
সাংগঠনিক সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর সারজিস আলম চাঁদপুর প্রেসক্লাবে এনসিপির সাংগঠনিক সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
এনসিপির চাঁদপুর জেলার আহ্বায়ক মো. মাহবুব আলমের সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব আমানুল্লাহ পাটোয়ারীর সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ ও সরোয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন, কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আতাউল্লাহ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক রিফাত রশিদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সভায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সারজিস আলমের বক্তব্যে এদিন একদিকে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, অন্যদিকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতা থাকতে হবে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁর মতে, বিচারহীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতি অব্যাহত থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।