ঘর থেকে সংসদ পর্যন্ত নারীর মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী আইনপ্রণেতা নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে নারী সংহতি। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়ায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে আয়োজিত এক সমাবেশে এসব দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
নারী সংহতির নেতারা বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি নারীর দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি। কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধার ঘাটতি, বিদ্যালয়ে স্যানিটারি প্যাডের সহজলভ্যতা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগ এবং কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন—এসব বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
নারী সংহতির পাঁচ দফা দাবি
সমাবেশ থেকে নারী সংহতি যে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে, সেগুলো হলো—
১. জাতীয় সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী আইনপ্রণেতা নিশ্চিত করা।
২. ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ডে-কেয়ার সেন্টারের চাহিদা পূরণ করা।
৩. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক নেওয়ার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা।
৪. ‘বাল্ক প্রকিউরমেন্ট মডেলের’ মাধ্যমে দেশের সব বিদ্যালয়ে অর্ধেক দামে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ করা।
৫. দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন পাস করা।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, এসব দাবি শুধু নারীদের জন্য আলাদা কোনো সুবিধা চাওয়ার বিষয় নয়; বরং নারীর নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
‘জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অবদানের প্রতিফলন ঘটেনি’
সমাবেশে সূচনা বক্তব্যে নারী সংহতির সভাপতি শ্যামলী শীল বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের আন্দোলনে ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তাঁর মতে, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে নারীরা বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়ায় তাঁদের সেই অবদানের যথাযথ প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।
শ্যামলী শীল বলেন, নারী সংহতি জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এখনো সেই দাবি উপেক্ষিত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের অবদানের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে না। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করাই হতে হবে রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
‘নারী শুধু মা বা বোন নয়, নাগরিকও’
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, নারী সংহতির মূল দাবি হলো ঘর থেকে সংসদ পর্যন্ত সর্বত্র নারীর নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্র নারীদের প্রায়ই মা, বোন বা পরিবারের কোনো সম্পর্কের পরিচয়ে মূল্যায়ন করে। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে নারীর নিজস্ব পরিচয় ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
তাসলিমা আখতারের মতে, নারীর নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার শুরুটা ঘর থেকেই হওয়া উচিত। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে নারীর সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৫১ শতাংশ নারী হলেও জাতীয় সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। ফলে ভোটার হিসেবে নারীর যে গুরুত্ব রয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তাঁর বক্তব্য, নারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ বা করুণা চান না। নাগরিক হিসেবে তাঁরা ন্যায্য রাজনৈতিক মনোনয়ন ও সংসদে প্রতিনিধিত্ব চান।
এই বিশাল নারী ভোটারদের নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
‘ডে-কেয়ারের অভাবে চাকরি ছাড়ছেন নারীরা’
কর্মজীবী নারীদের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে ডে-কেয়ার সুবিধার ঘাটতির কথা তুলে ধরেন নারী সংহতির সহসাধারণ সম্পাদক রেবেকা নীলা।
তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বর্তমানে যে ডে-কেয়ার সুবিধা রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তাঁর দাবি, বিদ্যমান সুবিধা মোট চাহিদার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশের মতো।
রেবেকা নীলার মতে, প্রতিটি ওয়ার্ডে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা সরকারের জন্য অসম্ভব কোনো কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পরিকল্পনা।
তিনি বলেন, সন্তান লালন-পালনের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী নারীকে চাকরি ছাড়তে হচ্ছে। গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, শিশুর যত্নের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় ৭৩ শতাংশ কর্মজীবী নারী চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
শুধু চাকরি ছাড়ার মধ্যেই সমস্যা সীমাবদ্ধ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অনেক মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারী বাধ্য হয়ে শিশুকে ঘরে রেখে অফিসে যান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুকে ঘরে তালাবদ্ধ রেখেও কর্মস্থলে যেতে হয়।
অন্যদিকে অনেক শ্রমিক নারী তাঁদের সন্তানদের গ্রামে আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখে কাজ করেন। এতে কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে সারাক্ষণ সন্তানের নিরাপত্তা ও যত্ন নিয়ে উদ্বেগ কাজ করে।
রেবেকা নীলা বলেন, এই নিরবচ্ছিন্ন দুশ্চিন্তা নারীর কর্মপরিবেশের পাশাপাশি তাঁদের মানসিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তাই ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে প্রয়োজন অনুযায়ী ডে-কেয়ার সেন্টার নিশ্চিত করার দাবি জানায় নারী সংহতি।
‘৩৩ শতাংশ নয়, এখন সমান প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্য’
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে গবেষক মাহিন সুলতান বলেন, স্বাধীনতার প্রায় ৬০ বছর পার হতে চললেও নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এখনো ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের দাবিকে কেন্দ্র করে আলোচনা করতে হচ্ছে।
তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে নারীর অধিকার আন্দোলনের দাবিও পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
মাহিন সুলতান বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন শুধু নির্দিষ্ট একটি শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোয় নারী-পুরুষের সমান প্রতিনিধিত্বের দাবি জোরালো হচ্ছে।
তাই জাতীয় সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে ৫০ শতাংশ বা সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর বক্তব্য, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার প্রতিফলন আরও ভালোভাবে ঘটবে।
‘জুলাইয়ের নারী নেতৃত্বকে নীতিনির্ধারণ থেকে দূরে রাখা হয়েছে’
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফারহানা মুনাও জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে যেসব নারী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের পরিকল্পিতভাবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
ফারহানা মুনার ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নতুন ক্ষমতায়ন কাঠামোতে নারীদের যথাযথ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হয়নি।
তাঁর মতে, যে আন্দোলনে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন, সেই আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া উচিত। বিশেষ করে আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পর তাঁদের নীতিনির্ধারণী কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হলে তা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতিই প্রকাশ করবে।
নিরাপদ শিক্ষা ও কর্মপরিবেশের দাবিও সামনে
নারী সংহতির পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি নারীর দৈনন্দিন জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিদ্যালয়ে অর্ধেক দামে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহের দাবি তুলে সংগঠনটি বলেছে, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাল্ক প্রকিউরমেন্ট বা বড় পরিসরে একসঙ্গে পণ্য কেনার মাধ্যমে কম দামে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ করা সম্ভব বলে তারা মনে করে।
অন্যদিকে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য জনপরিসরে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সংসদে দ্রুত একটি কার্যকর আইন পাস করা প্রয়োজন। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এর কার্যকর প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে নারী সংহতি। সংগঠনটি ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
নারী সংহতির নেতাদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁরা মনে করেন, নারীকে শুধু পরিবার ও গৃহস্থালির দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সব পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে—জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণকে কেবল আন্দোলনের একটি অধ্যায় হিসেবে দেখলে চলবে না; রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ কাঠামোতেও সেই অংশগ্রহণের প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
নারী সংহতির নেতারা বলেন, সংসদে নারী আইনপ্রণেতার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা, প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ, মাসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ—এসব বিষয়কে নারীর মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের সামগ্রিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
তাঁদের দাবি, ঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নারীর সমান মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।