চার বছর আগে কুমিল্লার দেবীদ্বার সরকারি রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পাশাপাশি বসত মো. আবদুল্লাহ আল তামিম ও ফাহিম শারিয়ার সিজান। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। কিন্তু ফাহিমের বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলামের বদলির কারণে সপ্তম শ্রেণিতেই দেবীদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে যেতে হয় তাকে। এরপর আর দেখা হয়নি দুই বন্ধুর।
চার বছর পর শনিবার কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল তাদের। দুজনই এসেছিল ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। পুরোনো বন্ধুকে সামনে দেখে প্রথমে যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না দুজনের। এরপর আলিঙ্গন, হাসি আর পুরোনো দিনের গল্পে ফিরে গেল দুই বন্ধু।
তবে সেই দেখা হওয়ার সঙ্গে যুক্ত হলো আরও একটি চমক। চার বছর আগে যে বন্ধুত্ব বিচ্ছেদে থেমে গিয়েছিল, এবার যেন সেখান থেকেই নতুন করে পথচলা শুরু হলো। তামিম ও ফাহিম দুজনই ভর্তি হয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল কলেজে। একই কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও এত দিন তাদের দেখা হয়নি।
ফাহিম এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা পুলিশ লাইনস স্কুল থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে। আর তামিমও জিপিএ–৫ পেয়েছে তার পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেবীদ্বার সরকারি রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে।
তামিম বলল, ‘ফাহিম আর আমি প্রায় দুই বছর একসঙ্গে পড়েছি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। ও যখন দেবীদ্বার থেকে চলে যায়, তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল।’
চার বছর পর বন্ধুকে ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত ফাহিমও। তার ভাষায়, ‘সিনেমায় অনেক সময় এমন দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনেও যে এমন কিছু ঘটবে, তা কল্পনাও করিনি। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, তামিম আর আমি এখন একই কলেজে ভর্তি হয়েছি। এবার নিশ্চয়ই আমাদের বন্ধুত্ব ও পথচলা দীর্ঘ হবে।’
কৃতীদের মিলনমেলা
প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে ৬৪ জেলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ আয়োজন।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
শনিবার কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এ সংবর্ধনার কুমিল্লা পর্ব। জেলার প্রায় ২ হাজার ৬০০ কৃতী শিক্ষার্থী এ অনুষ্ঠানের জন্য নিবন্ধন করে। তাদের সঙ্গে অংশ নেন অনেক অভিভাবকও।
সকাল আটটা থেকেই শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করে। কেউ এসেছে মা–বাবার সঙ্গে, কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে দল বেঁধে। নিবন্ধন বুথ থেকে ক্রেস্ট, খাবার ও উপহারসামগ্রী সংগ্রহের পর তারা ঘুরে দেখে প্রথম আলোর বিভিন্ন আয়োজন ও স্টল। ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সকাল থেকেই পুরো প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান। তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বক্তব্য পড়ে শোনান।
জিপিএ–৫-এর পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান
কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জিপিএ–৫ জীবনের সবকিছু নয়। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানবিকতাও ধরে রাখতে হবে।
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হাসনাত আনোয়ার উদ্দীন আহমেদ বলেন, শুধু পরীক্ষায় নয়, আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতায়ও জিপিএ–৫ পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের মা–বাবার সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক রাখার পরামর্শ দেন।
সফল হতে পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখার ওপর গুরুত্ব দেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন।
কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ বলেন, জিপিএ–৫ পাওয়া আর ভালো মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়। মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে হবে।
প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক তারেক মাহমুদও কুমিল্লা জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। নিজের শিকড় ও বিদ্যালয়ের স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জিপিএ–৫ একটি মাইলফলক, সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ। শিক্ষার্থীদের সামনে কলেজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর। এই সময় কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থবিদ্যাকে ‘না’ বলার শপথ পড়ান কুমিল্লা বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন।
কৃতীদের মুখে মা–বাবার সংগ্রামের গল্প
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শুধু সাফল্যের গল্পই উঠে আসেনি; উঠে এসেছে সেই সাফল্যের পেছনে থাকা মা–বাবার সংগ্রামের কথাও।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলার মোহনপুর আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে আরিফ আকতাব। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট সে। তার বাবা তিতু মিয়া একজন প্রান্তিক কৃষক।
মঞ্চে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বাবার সংগ্রামের কথাই বেশি বলেছে আরিফ। সে বলেছে, ‘আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। আমি ভালো মানুষ হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
লাকসামের আজগরা হাজী আলতাপ আলী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়েছে নাজিম উদ্দিন। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম কৃষক। অনুষ্ঠানে নাজিমের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার মা নাছিমা আক্তার ও বড় বোন ঝরনা আক্তার।
ছেলের সাফল্যে আনন্দিত নাছিমা আক্তার। তবে ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়েও তাঁর দুশ্চিন্তা রয়েছে। তিনি চান, ছেলে বড় চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করুক।
চৌদ্দগ্রামের মিয়ার বাজার তোষণ রফিক বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়েছে তাবাচ্ছুম আক্তার প্রমি। পারিবারিক জটিলতার কারণে ২০১৯ সাল থেকে তার বাবা ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর মায়ের টিউশনির আয়ে চলছে দুই মেয়ের পড়াশোনা।
প্রমি বলেছে, ‘আম্মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। আমি বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চাই। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
দাউদকান্দির নৈয়াইর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে মারজান সুলতানা। তার বাবা মো. মিজানুর রহমান দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কর্মরত। অনুষ্ঠানে মারজানের সঙ্গে এসেছিলেন বাবা, মা শাহনাজ আক্তার ও দুই ছোট বোন।
মারজানের স্বপ্নও চিকিৎসক হওয়া। তাঁর মা নৈয়াইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে আরও বড় হওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে। এ জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
দেবীদ্বারের আবদুর রহিম মুন্সী ও রূপালী বেগম দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে সবার ছোট জান্নাতুল মাওয়া। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে সে। মেয়ের সংবর্ধনায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী আবদুর রহিম মুন্সী।
গান, নাচ ও কুইজে উৎসবের আমেজ
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল নানা আয়োজন। ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে কুমিল্লা বন্ধুসভার সদস্য ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাত্রিকা ঘোষ (রূপকথা)।
শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর মেন্টর দিবা চৌধুরী ও আদনান শাহেদ অর্ণব শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।
পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ কাউসার। ঢাকা থেকে আসা শিল্পীদের গান ও নাচে মুখর হয়ে ওঠে সংবর্ধনাস্থল। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, ছবি তোলা ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দুপুর পর্যন্ত অনুষ্ঠানস্থলে উৎসবের আমেজ ধরে রাখে কৃতী শিক্ষার্থীরা।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানান কুমিল্লা বন্ধুসভার সভাপতি প্রশান্ত কর্মকার ও সাধারণ সম্পাদক হানিফ মোসাব্বির।
অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেনি রাফসান, তবু ফিরল হাসি
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের শেষদিকে ঘটে আরেকটি মানবিক ঘটনা।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কান্দুঘর বিনোদ বিহারী সেন উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে রাফসান আহমেদ। শিক্ষক মা রোজিনা আক্তারকে নিয়ে রাফসান ঢাকায় গিয়েছিল ভর্তি পরীক্ষা দিতে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শনিবার সকালেই মা–ছেলে ঢাকা থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন।
কিন্তু পথে যানজটসহ নানা ভোগান্তিতে পড়ে তাঁরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান বেলা একটার দিকে। ততক্ষণে সংবর্ধনার মূল আয়োজন শেষ হয়ে গেছে। কৃতী শিক্ষার্থীরাও অনুষ্ঠানস্থল থেকে বিদায় নিয়েছে।
তারপরও জিলা স্কুল মাঠে আসতে পেরে কিছুটা তৃপ্ত রাফসান। একপর্যায়ে সে ও তার মা প্রথম আলোর কুমিল্লা কার্যালয়ে যান। সেখানে প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমান রাফসানকে বলেন, ‘মন খারাপ করার কিছু নেই, তোমাকে আমরা এইচএসসি পরীক্ষার পরে সংবর্ধনা দেব।’
এই কথা শুনে কিছুটা মলিন হয়ে থাকা রাফসানের মুখে আবার হাসি ফুটে ওঠে।
আর একই দিনে কুমিল্লা জিলা স্কুল মাঠে চার বছর পর পুরোনো বন্ধুকে ফিরে পাওয়া তামিম ও ফাহিমের গল্পের মতো রাফসানের এই ঘটনাও সংবর্ধনা আয়োজনটিকে শুধু ফলাফল উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; সেখানে জড়িয়ে গেছে বন্ধুত্ব, পরিবারের সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে পথচলার গল্প।