রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ইতালির শীর্ষ ব্যাংকার ও একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর পরিচয় ও কণ্ঠস্বর নকল করে বড় ধরনের জালিয়াতি করেছে প্রতারকেরা। এ ঘটনায় ইতালির সর্ববৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইন্তেসা সানপাওলোর প্রাইভেট ব্যাংকিং শাখা ফিদিয়ুরাম থেকে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো (প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার) হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র গত শুক্রবার রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো বলেছে, পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে চুরি যাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ইউরো এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
ইতালির সংবাদমাধ্যম করিয়েরে দেল্লা সেরা প্রথম এ জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ করে।
যেভাবে শুরু হয় জালিয়াতি
ঘটনাটির সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় ফিদিয়ুরামের তৎকালীন চেয়ারম্যান পাওলো মোলেসিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পান। বার্তাটি দেখে মনে হয়েছিল, সেটি ইন্তেসা সানপাওলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কার্লো মেসিনার কাছ থেকে পাঠানো হয়েছে।
বার্তায় একটি বৈদেশিক লেনদেনের জন্য জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। বার্তাটির বিষয়বস্তু এবং প্রেরকের পরিচয় দেখে অনুরোধটি সত্যি বলে মনে করেন মোলেসিনি।
তবে প্রতারকেরা এখানেই থামেনি। অনুরোধটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে তাঁরা একটি নামী আইনি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ অংশীদারের ফোন নম্বর থেকে এসেছে বলে মনে হওয়া একটি ফলোআপ কল করেন।
সূত্রগুলোর দাবি, ওই ফোনকলে আইনজীবীর কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা এবং পরবর্তী ফোনকল—দুই মাধ্যমেই প্রতারকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচিত ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের ছদ্মবেশ ধারণ করতে সক্ষম হয়।
বিদেশি অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি ইউরো
অনুরোধটি আসল বলে বিশ্বাস করার পর মোলেসিনি তাঁর অর্থ বিভাগকে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এরপর প্রধানত চীন ও হংকংয়ের একাধিক বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো পাঠানো হয়।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের পরিচিত যোগাযোগব্যবস্থা ও কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করায় প্রতারণাটি প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়েনি বলে ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ইন্তেসা সানপাওলো ও ফিদিয়ুরাম—দুই প্রতিষ্ঠানই এ বিষয়ে রয়টার্সের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
দ্রুত শনাক্ত হয় অনিয়ম
অর্থ স্থানান্তরের পর ফিদিয়ুরাম দ্রুতই লেনদেনে অনিয়ম শনাক্ত করে। এরপর ব্যাংকটি বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, চীন, পর্তুগাল ও ইতালির কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ ইউরো উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তবে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন বিদেশি অ্যাকাউন্টের একটি নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ওই অর্থের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হয়। এ কারণে বাকি প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ইউরোর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তদন্তে ফিদিয়ুরামের কর্মকর্তারা অভিযুক্ত নন
ঘটনাটির তদন্ত চললেও মোলেসিনি বা ফিদিয়ুরামের অন্য কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে না বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে মিলানের প্রসিকিউটররা কম্পিউটার জালিয়াতির সন্দেহে ইউরোপের বাইরে বসবাসকারী এক বিদেশি নাগরিককে তদন্তের আওতায় এনেছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তকারীরা কীভাবে প্রতারকেরা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিল এবং অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশকে কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল, তা খতিয়ে দেখছেন বলে জানা গেছে।
পদত্যাগ করেছিলেন মোলেসিনি
জালিয়াতির ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর গত মার্চে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ফিদিয়ুরামের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন পাওলো মোলেসিনি। তাঁর পদত্যাগের সময় ফিদিয়ুরামের পক্ষ থেকে এর বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, মোলেসিনি বা ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ঘটনার কারণে কোনো তদন্ত চলছে না।
এআই দিয়ে কণ্ঠস্বর নকলের ঝুঁকি
ব্যাংকিং খাতে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা নতুন নয়। তবে এআই প্রযুক্তির উন্নতির ফলে প্রতারকেরা এখন পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বরও অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে নকল করতে পারছেন। ফলে শুধু ফোনে কণ্ঠস্বর শুনে কোনো অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশের সত্যতা যাচাই করা আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ইতালিতে এ ধরনের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। গত বছর প্রতারকেরা এআই ব্যবহার করে দেশটির এক মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করেছিল। সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ব্যবসায়ী মাসিমো মোরাত্তিকে একটি বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০ লাখ ইউরো পাঠাতে প্ররোচিত করা হয়। পরে ওই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ফিদিয়ুরামের ঘটনায় ব্যবহৃত কৌশলটি সেই ঝুঁকির আরও বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। এখানে শুধু কণ্ঠস্বর নয়, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, পরিচিত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং পরবর্তী ফোনকল—সবকিছু মিলিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
ব্যাংকিং নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ
ফিদিয়ুরামের ঘটনায় বিপুল অর্থের একটি অংশ দ্রুত উদ্ধার করা গেলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এখনো নিখোঁজ। বিশেষ করে বিদেশি অ্যাকাউন্টের একাধিক স্তর পেরিয়ে অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরিত হলে তা শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জন্য আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ঘটনাটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে, এআই-নির্ভর পরিচয় ও কণ্ঠস্বর নকলের মাধ্যমে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ যাচাইব্যবস্থাকেও লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব। ফলে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে শুধু পরিচিত ব্যক্তির বার্তা বা কণ্ঠস্বরের ওপর নির্ভর না করে অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়ার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।