ঢাকা

জাসদের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ২৮৯ জনকে আটক পুলিশের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ২৮৯ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শনিবার দুপুরের পর শুরু হওয়া এ অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন থানায় নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে জাসদের নেতা–কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা তিনটার দিকে গুলিস্তানের জিপিও মোড়ে অবস্থিত জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান শুরু হয়। সন্ধ্যার পরও সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল। দিনের শুরুতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আটকের সংখ্যা অর্ধশতাধিক থেকে শতাধিক বলে জানানো হলেও রাতে পুলিশ ২৮৯ জনকে আটকের কথা জানায়।

ডিএমপির মতিঝিল অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) সাকিবুল আলম ভূঁইয়া রাত ১১টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, জাসদ কার্যালয় থেকে ২৮৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে যাঁরা জাসদের নেতা–কর্মী, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে। অন্যদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে বলেও পুলিশ খবর পেয়েছিল। পরে সেখানে থাকা ব্যক্তিদের আটক করে থানায় নেওয়া হয়।

পুলিশের বক্তব্য

অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়ে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার আকতার হোসেন জানিয়েছিলেন, জাসদ কার্যালয়ে একটি রাজনৈতিক সমাবেশ থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা গোপন বৈঠক করছিলেন কি না, তাঁদের পরিচয় কী এবং তাঁদের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

তবে রাতে পুলিশের দেওয়া ২৮৯ জন আটকের হিসাবের মধ্যে কতজন জাসদের নেতা–কর্মী এবং কতজনকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পৃথক সংখ্যা জানানো হয়নি।

জাসদের বক্তব্য

অভিযানের কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হওয়ার যে তথ্য পুলিশ জানিয়েছে, তা অস্বীকার করেছে জাসদ।

দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাসদ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভাটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। এ সভা আয়োজনের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার, মতিঝিল জোনের উপকমিশনার (ডিসি) এবং পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছিল।

বিবৃতিতে জাসদ বলেছে, দলটি নিষিদ্ধ নয় এবং জাসদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপরও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভায় অংশ নেওয়া সবাই জাসদের নেতা ও সদস্য ছিলেন বলে দাবি করেছে দলটি।

জাসদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভায় প্রায় ৫০০ নেতা–কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন নারী ছিলেন।

দলটির অভিযোগ, যুবদলের প্রায় ৫০০ নেতা–কর্মী পুলিশের উপস্থিতিতেই জাসদ কার্যালয়ে ঢুকে ‘মব’ সৃষ্টি করেন এবং নেতা–কর্মীদের শারীরিকভাবে আঘাত করেন। পরে পুলিশ পুরো কার্যালয় ঘেরাও করে সেখানে উপস্থিত নেতাদের আটক করে পল্টন, শাহজাহানপুরসহ বিভিন্ন থানায় নিয়ে যায়।

জাসদ দাবি করেছে, তাদের সাংগঠনিক সভাকে আওয়ামী লীগের সভা হিসেবে উপস্থাপন করে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন।

কার্যালয়ে আগে থেকেই প্রতিনিধি সভা চলছিল: জাসদ

জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলছিল এবং সেখানে দলের নেতা–কর্মীরাই উপস্থিত ছিলেন।

তিনি জানান, আটকদের মধ্যে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যও রয়েছেন। তিনি কেন জাসদ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আবু জাফর সূর্য জাসদ সমর্থক হওয়ায় দলের কার্যালয়ে এসেছিলেন।

আবু জাফর সূর্যকে আটকের বিষয়টি দিনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁকে পল্টন থানায় নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

শনিবার দুপুরের পর গুলিস্তানের জিপিও মোড় এলাকায় জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সেখানে থাকা কয়েক ডজন ব্যক্তিকে আটক করে থানায় নেওয়ার খবর আসে। পরে আটকের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্রে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আটকের তথ্য পাওয়া যায়। সন্ধ্যায় পুলিশ জানায়, জাসদ কার্যালয় থেকে প্রায় ৩০০ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পরে ডিএমপির মতিঝিল অঞ্চলের কর্মকর্তার কাছ থেকে ২৮৯ জন আটকের নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের সবার রাজনৈতিক পরিচয় এক নয়—এ কারণে যাচাই-বাছাই শেষে কার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

আটকদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত যাচাই শেষে

পুলিশ জানিয়েছে, শুধু জাসদ কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার কারণে সবাইকে আইনগতভাবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না। আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং সেখানে তাঁদের উপস্থিতির কারণ যাচাই করা হচ্ছে।

ডিএমপির কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁরা জাসদের নেতা–কর্মী হিসেবে শনাক্ত হবেন, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে। অন্যদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, জাসদ বলছে, কার্যালয়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা দলেরই নেতা–কর্মী এবং সেখানে পূর্বনির্ধারিত সাংগঠনিক সভা চলছিল। ফলে পুলিশি অভিযানে তাঁদের আটক করার ঘটনাকে দলটি অন্যায় বলে দাবি করেছে।

এ ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য ও জাসদের দাবির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো—কার্যালয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম চলছিল, তা নিয়ে। পুলিশ বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা সেখানে জড়ো হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। আর জাসদের দাবি, এটি ছিল তাদের পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা এবং অংশগ্রহণকারীরা সবাই জাসদের নেতা–কর্মী।

রাত পর্যন্ত আটক ২৮৯ ব্যক্তির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলছিল। যাচাই শেষে কতজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং কতজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স