বিগত ১৭ বছরে গুম, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আর বাংলাদেশের মাটিতে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের কোনো স্থান নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গণহত্যায় জড়িত প্রত্যেকের বিচার নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর ধোলাইখাল–সংলগ্ন সাদেক হোসেন খোকা মাঠে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
সমাবেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত ১৭ বছরে যারা গুম, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে, সেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তিকে আর কোনো দিন বাংলাদেশের মাটিতে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের কোনো ঠাঁই নেই। গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার প্রসঙ্গ
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল বৈঠক এবং ডিসেম্বরে তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে সমাবেশে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এবং ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরাও চাই, তিনি (শেখ হাসিনা) দেশে ফেরত আসুক এবং বিচারের মুখোমুখি হোক। সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা যে দেশে অবস্থান করছে, সেই দেশের সরকারকে আহ্বান জানাই, আপনারা তাদের ফিরিয়ে দিন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মানের বিচার সম্পন্ন করেছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় আসামিদের আপিলের সুযোগ থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা ভোগ করা কিংবা বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে কারও রক্ষা নেই।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্লোগান না দেওয়ার আহ্বান
সমাবেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্লোগান পরিহারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির নামে স্লোগান দেওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এখন থেকে স্লোগান হবে রাজনৈতিক, যা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং শহীদদের রক্তকে মর্যাদা দেওয়ার কথা বলবে।’
সরকারের সাত মাসের কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য
বর্তমান সরকারের গত সাত মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাপক জন–আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। সরকার রাজনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার কাজ করছে।
তবে এই সময়ের মধ্যেই একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন এবং লংমার্চের মতো কর্মসূচির হুংকার দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও বিরোধীরা রাস্তায় নেমেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা উত্তরের লংমার্চ শেষ করে দক্ষিণে যাচ্ছেন এবং পূর্ব ও পশ্চিমেও যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের এই কৌশল বুঝে গেছে। চার বছরের মাথায় কোনো আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সরকারের সাত মাসের মাথায় এ ধরনের তৎপরতা ভিত্তিহীন।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে ব্যাখ্যা
সমাবেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম বহুগুণ বেড়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণের ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রথম এক মাস জ্বালানি তেলের দাম এক টাকাও বাড়াননি। তবে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার রোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সর্বনিম্ন পরিমাণে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের সাময়িক দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে বাংলাদেশেও আনুপাতিক হারে দাম কমানো হবে বলে আশ্বাস দেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের আহ্বান
দেশের মানুষকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজপথে রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো হয়েছে। এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুসংহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখা জরুরি। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল ও জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।