রয়টার্স | জাতিসংঘ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরান ও কিউবা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছে চীন। শনিবার সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং বেইজিংয়ের অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও তিনি তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি।
ভাষণে হান ঝেং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কিউবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি বন্ধ করা এবং দেশটির ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি।
চীনের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন চলতি সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে সি চিন পিংকে সামরিক বিমানের ফ্লাইওভার এবং জমকালো রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের মাধ্যমে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।
পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের আহ্বান
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে হান ঝেং বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় পরাশক্তিগুলোর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। নিয়মকানুন মেনে চলা, আইনের শাসন বজায় রাখা এবং সঠিক কাজের ক্ষেত্রে বড় দেশগুলোর নেতৃত্ব দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হান বলেন, পারস্য উপসাগরসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ছোট কিংবা বড়—সব দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমান সদস্য। বিশ্বের বিভিন্ন বিরোধ ও সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তির পরিবর্তে জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরেন।
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পরোক্ষ বার্তা
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটেই চীনের এই বক্তব্য এসেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানে মার্কিন যুদ্ধ শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। এরই মধ্যে ইরানকে সামরিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া থেকে চীনকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।
গত শুক্রবার চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা না দিতে চীনের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, জবাবে চীন এমন সহায়তা করবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে।
কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে চীন দিয়েছে এবং বেইজিংয়ের সহায়তায় তেহরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির পথ খুঁজে পেয়েছে—এমন খবর প্রকাশের পর ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়।
তবে জাতিসংঘে হান ঝেংয়ের বক্তব্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে চীনের মৌলিক মতপার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিলেও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মানের আহ্বান জানান।
কিউবার অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান
কিউবা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
হান ঝেং বলেন, চীন সংশ্লিষ্ট দেশকে অবিলম্বে কিউবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে কিউবার ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার জন্যও তিনি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কিউবার বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা উচিত।
কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দেশটির অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি করেছে বলে হাভানার পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করা হয়ে আসছে।
বিদ্যুৎ–সংকটে কিউবা
চীনের বক্তব্যের সময় কিউবায় বিদ্যুৎ–সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলতি মাসের শুরুতে দেশটির বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এতে লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন এবং দেশজুড়ে অন্ধকার নেমে আসে।
কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা এমনিতেই বহু বছর ধরে জ্বালানিসংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে চাপে ছিল। পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং জ্বালানির ঘাটতির কারণে নিয়মিত বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের মুখে পড়ছিল দেশটি।
তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার তেল সরবরাহের ওপর আরও কঠোর চাপ সৃষ্টি করার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে কিউবার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এরপর বিদ্যুৎ–বিভ্রাট আরও ঘন ঘন হতে থাকে এবং কয়েকবার পুরো বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
রাশিয়ারও একই অবস্থান
চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পর জাতিসংঘের একই অধিবেশনে কিউবা ইস্যুতে একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
তিনি কিউবার ওপর থেকে ‘অবরোধ’ প্রত্যাহারের জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ক্যারিবীয় অঞ্চলের বৃহত্তম এই দ্বীপদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও তুলে নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
লাভরভ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কিউবাকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা দেশের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।
ফলে একই দিনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে চীন ও রাশিয়ার বক্তব্যে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে অভিন্ন আপত্তির বিষয়টি সামনে আসে।
চীনের ‘বিশ্বস্ত অংশীদার’ হওয়ার বার্তা
হান ঝেং তাঁর ভাষণে চীনকে বৈশ্বিক মঞ্চে একটি বিশ্বস্ত অংশীদার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর দৃঢ় সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সব দেশ সমান। কোনো দেশের আয়তন, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা তার আন্তর্জাতিক অধিকারের ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাড়তি মর্যাদা তৈরি করা উচিত নয়।
চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, আন্তর্জাতিক বিরোধ ও বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর সমাধান আলোচনার মাধ্যমে করা উচিত। শক্তি প্রয়োগ বা একতরফা চাপের পরিবর্তে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সি–ট্রাম্প বৈঠকের পর ভিন্ন বার্তা
চীনের এই বক্তব্যের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর মাত্র কয়েক দিন আগে ওয়াশিংটনে সি চিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে ওই বৈঠক ছিল প্রকাশ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ। সামরিক বিমানের ফ্লাইওভার ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজসহ নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানো হয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু জাতিসংঘের মঞ্চে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে ইরান ও কিউবা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি স্পষ্ট আপত্তি জানানো হলো। যদিও তিনি কোনো পর্যায়েই যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি।
এতে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বেইজিং তার নিজস্ব নীতিগত অবস্থানও প্রকাশ্যে তুলে ধরছে।
ইরান ও কিউবা—দুই ইস্যুতেই চীনের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, অবরোধ প্রত্যাহার এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান। একই দিনে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও কিউবা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা আসায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ওয়াশিংটনের নীতির বিপরীতে বেইজিং ও মস্কোর অবস্থান নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে।