ঢাকা

মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া: ‘দেশে সরকার আছে কি না, প্রশ্ন তৈরি হয়েছে’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও পরে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, রাজধানীর বুকে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে চর দখলের মতো গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল করে নেওয়ার ঘটনায় দেশে আদৌ কোনো সরকার আছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, রাতভর ওই প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ও নির্বিকার ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তিনি এ ঘটনাকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, তার একটি গুরুতর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আজ শনিবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। পরে এনসিপির পক্ষ থেকে তাঁর বক্তব্য গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।

‘এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না’

ফেসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানে রাতভর ভাঙচুর ও লুটপাট চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন, ‘রাতভর প্রতিষ্ঠানটিতে ভাঙচুর ও লুটপাট চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ও নির্বিকার ভূমিকা গভীর উদ্বেগের। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না।’

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, ‘খোদ রাজধানীর বুকে চর দখলের মতো একটি হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল করে নেওয়ার ঘটনায় দেশে আদৌ কোনো সরকারের অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ নিয়ে নাহিদের বক্তব্য

নাহিদ ইসলামের পোস্টে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ভাঙচুর ও দখলদারির পেছনে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া নাহিদের পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, দিনের পর দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ পরিস্থিতিকে তিনি দেশের জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।

জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি

রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি এর নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। তাঁদের আইনের আওতায় এনে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো বার্তায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় শুধু ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; ঘটনার পেছনে কারা ছিল, তাদেরও তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা প্রয়োজন।

কী ঘটেছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে

রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে। অভিযোগ রয়েছে, মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালায়।

হামলাকারীরা প্রথমে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে এবং তাঁদের হাত-পা বেঁধে রাখে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে থাকা মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও নগদ অর্থ লুট করা হয়।

লুটপাটের পর ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে হামলাটি চালানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষয়ক্ষতি এক কোটি টাকার বেশি

হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার।

ঘটনার পর তিনি বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলাটিতে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে তদন্ত চলছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।

পাঁচ দশক ধরে মা ও শিশুর সেবা

রাড্ডা এমসিএইচ–এফপি সেন্টারটি প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রসূতি মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি টিকাদান কার্যক্রমও পরিচালনা করত।

দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনায় চিকিৎসাসেবা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা ও ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স