ঢাকা

সংবিধান সংশোধনে ঐকমত্য চান সম্পাদকরা, বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে যতটা সম্ভব ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকট এড়াতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

রোববার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় এসব পরামর্শ আসে। প্রায় তিন ঘণ্টার এ বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন অংশগ্রহণকারীরা।

সভাটি ছিল রুদ্ধদ্বার। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি। সম্পাদক ও সাংবাদিকদের অনেকে বলেন, সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যতটা সম্ভব ঐকমত্য তৈরি করা প্রয়োজন।

বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকেও বলা হয়, বিরোধী দলকে কমিটিতে যুক্ত করার জন্য এরই মধ্যে একাধিকবার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা যখনই অংশ নিতে চাইবে, তাদের স্বাগত জানানো হবে।

‘বিরোধী দল এলে তাদের মতামত বিবেচনা করা হবে’

মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, সম্পাদকদের মধ্যে অনেকেই বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে যুক্ত করার জন্য আহ্বান জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কমিটিও এ বিষয়ে একমত। বিরোধী দল কমিটিতে এসে তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব দিলে সেগুলো বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের কাজটি তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে করতে চান এবং বিরোধী দলের প্রতি তাঁদের আহ্বান অব্যাহত থাকবে।

বর্তমানে বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো প্রতিনিধি দেয়নি বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। ওই দলগুলো কমিটির ধারণাগত ভিত্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সদস্য না দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে।

ক্ষমতার ভারসাম্য আনার পরামর্শ

বৈঠক সূত্র জানায়, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিধি, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী ও একই ব্যক্তি যাতে একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের প্রধানের দায়িত্ব পালন না করেন, এমন বিধান করার পরামর্শও এসেছে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে ভবিষ্যতে তা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সংবিধান সংশোধনের সময় ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেন তাঁরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়েও মতামত দেন সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা।

বৈঠক সূত্র জানায়, অনেকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না করা এবং বিচার বিভাগকে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামোর বাইরে রাখার মতও এসেছে।

তাঁদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠান এককভাবে এর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশের জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, এ নিয়েও মতবিনিময়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক সূত্র জানায়, কেউ কেউ উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে মত দেন। তবে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শুধু নিম্নকক্ষে আসনসংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ না করে সেখানে ভিন্নমত ও বিরোধী দলের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়।

শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, কার্যকর সিদ্ধান্তের তাগিদ

মতবিনিময়ে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের কেউ কেউ অতীতের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

তাঁদের মতে, বিভিন্ন পক্ষের মতামত গ্রহণের পর সেগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলোচনা ও সমঝোতার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন।

বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অংশগ্রহণকারীরা চাইলে পরে লিখিত আকারেও তাঁদের প্রস্তাব কমিটির কাছে পাঠাতে পারবেন।

জানুয়ারিতে সংসদে আসতে পারে সংশোধনী বিল

মতবিনিময় শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের আশা করছে বিশেষ কমিটি।

তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির কাজ ও প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে সংশোধনী বিল সংসদে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশোধনী বিল সংসদে পাস হওয়ার পর যেসব বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে।

কোন ক্ষেত্রে গণভোট হতে পারে

গণভোটের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের বিষয়টি সামনে আসে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ গণভোটের সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় থাকা কোনো বিষয়ে পরিবর্তন আনা হলে সংশোধনী সংসদে পাস হওয়ার পর এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটের প্রয়োজন হবে। তবে পুরো সংবিধান সংশোধনী বিলের ওপর একসঙ্গে গণভোট হবে না বলেও তিনি জানান।

বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টি তারা বিবেচনায় রাখছে। তবে গণভোটের অধ্যাদেশ এখনো আইনে রূপান্তরিত হয়নি—এমন কথাও বৈঠকে উঠে এসেছে।

যারা মতবিনিময়ে অংশ নেন

মতবিনিময় সভায় সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা অংশ নেন।

এ ছাড়া দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, কালবেলা সম্পাদক শন্তোষ শর্মা, মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আব্দুল হাই ছিদ্দিক, নয়া দিগন্ত–এর নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলি, আমার দেশ–এর যুগ্ম সম্পাদক এম আব্দুল্লাহ এবং বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–এর নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব আব্দুল আজিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন জামিল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি খাজা মাইন উদ্দিন ও বর্তমান সভাপতি দৌলত আকতার মালা উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষ কমিটির সদস্যরাও ছিলেন

বিশেষ কমিটির বৈঠকে সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ ছাড়াও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা ও মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।

সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংসদের কাঠামোগত সংস্কার—এসব বিষয়ে সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের দেওয়া পরামর্শ এখন বিশেষ কমিটির পরবর্তী আলোচনায় কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করে আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংশোধনী বিল সংসদে তোলার লক্ষ্য জানিয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স