ঢাকা

যুক্তরাজ্যে মার্কিন বিমানঘাঁটির কাছে ৫ জন গ্রেপ্তার, ৮৫ বাড়ি থেকে বাসিন্দাদের সরানো হলো

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রয়টার্স
ফেয়ারফোর্ড, ইংল্যান্ড

ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক বিমানঘাঁটির কাছে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ পুলিশ। তিনটি সন্দেহজনক ভ্যান ওই ঘাঁটির দিকে যাচ্ছিল—এমন খবর পাওয়ার পর রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে তাঁদের হেফাজতে নেওয়া হয়।

ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে ঘাঁটির আশপাশের প্রায় ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক তিনটি ভ্যানের চারপাশে প্রায় ৪০০ মিটারের নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট সেগুলো পরীক্ষা করছে।

ঘটনাটি ঘটেছে ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী এই ঘাঁটি ব্যবহার করে থাকে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহারের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ঘাঁটিটি বিশেষ নিরাপত্তা গুরুত্ব পেয়েছে।

‘বড় ধরনের ক্ষতি করার পরিকল্পনা ছিল’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা ঘাঁটিতে ‘বড় ধরনের ক্ষতি’ করার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি জানান, ব্রিটিশ ও মার্কিন কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তাঁদের বিষয়ে তদন্ত করছিল।

রোববার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ‘চমৎকার’ হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় সন্দেহভাজনদের আটক করা সম্ভব হয়েছে।

তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয়, জাতীয়তা বা তাঁদের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তদন্তও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

তিনটি সন্দেহজনক ভ্যানের খবর

ব্রিটিশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, রোববার স্থানীয় সময় রাত ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে তিনটি সন্দেহজনক গাড়ির বিষয়ে পুলিশকে ফোন করা হয়। গাড়িগুলো আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের দিকে যাচ্ছিল বলে মনে হয়েছিল।

খবর পাওয়ার পর সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান এবং ফেয়ারফোর্ডের পাশের ওয়েলফোর্ড এলাকায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেন। প্রথমে তাঁদের বিস্ফোরক-সংক্রান্ত আইনের অধীনে অপরাধের সন্দেহে আটক করা হয়। পরে সন্ত্রাসবাদ আইনের আওতায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহেও তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেররিজম পুলিশের জ্যেষ্ঠ জাতীয় সমন্বয়কারী ভিকি ইভান্স বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং পাঁচজনই হেফাজতে আছেন। ঘটনার পরিস্থিতি বোঝার জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হচ্ছে।

৮৫ বাড়ি খালি, এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী

সন্দেহজনক ভ্যানগুলো পরীক্ষা করার সময় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আশপাশের প্রায় ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের কাছাকাছি একটি অবকাশকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থলের চারপাশে প্রায় ৪০০ মিটারের নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞরা রোবটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভ্যানগুলো পরীক্ষা করেন।

গ্লস্টারশায়ার পুলিশ ঘটনাটিকে ‘বড় ধরনের ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করে। সহকারী প্রধান কনস্টেবল রিচার্ড ওকোনে বলেন, জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা রয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিস্থিতি নিয়ে অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে ব্যবহৃত হয় ফেয়ারফোর্ড

আরএএফ ফেয়ারফোর্ড যুক্তরাজ্যের মালিকানাধীন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী এটি পরিচালনাগতভাবে ব্যবহার করে। ঘাঁটিটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ৫০১তম কমব্যাট সাপোর্ট উইং ও ৪২০তম এয়ার বেস স্কোয়াড্রনের কার্যক্রম রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় মার্কিন বোমারু বিমান এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছে। এ কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঘাঁটিটি ঘিরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিতর্ক দুটিই বেড়েছে।

এর আগে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ফেয়ারফোর্ডের কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, ইরানের ভূখণ্ডে হামলার জন্য যে ঘাঁটি ব্যবহার করা হবে, সেটি তাদের কাছে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে রোববারের ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। তদন্তকারীরা এখনো গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য ও ঘটনার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখছেন।

অন্য মার্কিন ঘাঁটিতেও নিরাপত্তা জোরদার

ফেয়ারফোর্ডের ঘটনার পর যুক্তরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত অন্য সামরিক স্থাপনাগুলোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা পূর্ব ইংল্যান্ডের আরএএফ লেকেনহিথের প্রবেশপথে সাঁজোয়া যান ও সেনাসদস্যদের দেখতে পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একজন মুখপাত্র নির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ও সহযোগী ইউনিটগুলো সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং সামরিক সদস্য, বেসামরিক কর্মী, ঠিকাদার ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয় এবং সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্থাপনা ও সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ব্রিটেনে নাশকতার উদ্বেগ

ফেয়ারফোর্ডের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনা ঘিরে সম্ভাব্য নাশকতা এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

ব্রিটিশ মন্ত্রীরা এর আগে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড হামলা’ চালানোর অভিযোগ অবশ্য রাশিয়া অস্বীকার করে আসছে।

২০২৫ সালের জুনে মধ্য ইংল্যান্ডের একটি ব্রিটিশ সামরিক বিমানঘাঁটিতে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সদস্যরা ঢুকে পড়েছিলেন। ওই ঘটনার পর সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়।

ফেয়ারফোর্ডের সর্বশেষ ঘটনায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো হামলা সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে পাঁচজনের গ্রেপ্তার, তিনটি সন্দেহজনক ভ্যান পরীক্ষা এবং আশপাশের ৮৫টি বাড়ি খালি করার ঘটনায় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলকভাবে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য ও ঘটনার প্রকৃত পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স