ঢাকা

‘ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় প্রস্তুত ইরান’: আরাগচি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
তথ্যসূত্র: সিএনবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তা মোকাবিলার জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি থাকলেও কূটনীতির পথ বন্ধ করতে চায় না তেহরান। শান্তির কোনো সুযোগ হাতছাড়া না করার জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষেও তিনি অবস্থান নিয়েছেন।

রোববার মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাগচি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতায় অংশ নেন।

আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার সংঘাত শুরু হলেও ইরান তা মোকাবিলায় প্রস্তুত। তাঁর ভাষ্য, যেকোনো নতুন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেহরান দৃঢ় অবস্থানে থাকবে—সংঘাত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছালেও।

তবে একই সঙ্গে তিনি আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করেননি। আরাগচি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে ইরানের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তারপরও শান্তির কোনো সুযোগ যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য তিনি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে চান।

‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, একই সঙ্গে কূটনীতির পথও খোলা’

এনবিসি নিউজের অনুষ্ঠানে আরাগচি বলেন, ইরান যেমন আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তেমনি যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত। নতুন করে কোনো আগ্রাসন হলে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, কূটনীতির ক্ষেত্রে আগের অভিজ্ঞতার কারণে তেহরানের হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময়ও ইরানের ওপর হামলা হয়েছে। তারপরও শান্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমনটা মনে করে না তেহরান।

আরাগচির বক্তব্যের সারকথা হলো, সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—দুই পথই একসঙ্গে খোলা রাখতে চায় ইরান। তিনি বলেন, এখন কোন পথে পরিস্থিতি এগোবে, সেই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে।

সাত দিনের মধ্যে হরমুজ খোলার প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেয় ইরান। আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত তেহরান।

ইরানের প্রস্তাবে যুদ্ধ ও সামরিক চাপ কমানো, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং দেশটির তেল বিক্রির সুযোগ পুনর্বহালের মতো বিষয় রয়েছে। আরাগচি বলেছেন, এসব শর্ত নতুন কোনো দাবি নয়; বরং আগের সমঝোতার সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক সরবরাহের বড় একটি অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধাবস্থার প্রভাব জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়ছে।

ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান, আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় তেহরান

ইরানের প্রস্তাব প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরানের দেওয়া প্রস্তাব তাঁর প্রত্যাশিত চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে আরাগচি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যের পরও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যান পৌঁছায়নি। ফলে তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প রোববার বলেছেন, চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা আবারও হতে পারে। অর্থাৎ প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই পক্ষের অবস্থান কঠোর হলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

আরাগচি বলেন, আলোচনা ছাড়া বর্তমান অচলাবস্থা কাটানোর কার্যকর কোনো পথ নেই। তাঁর মতে, দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট থাকলেও আলোচনার সুযোগ পুরোপুরি নষ্ট করা উচিত হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবস্থান

ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, তেহরানের প্রস্তাবকে ওয়াশিংটন গ্রহণযোগ্য মনে করছে না।

এনবিসি নিউজের একই অনুষ্ঠানে ওয়াল্টজ বলেন, ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব এমন কিছু শর্ত সামনে এনেছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং মার্কিন নৌ অবরোধের অবসানের মতো বিষয় চেয়েছে।

ওয়াল্টজের অভিযোগ, ইরানের প্রস্তাব ছিল এমন একটি উদ্যোগ, যা গ্রহণ করা হবে না জেনেও সামনে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে—তবে ট্রাম্প পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখবেন।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ওয়াশিংটন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ওয়াল্টজের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন একটি সমঝোতা হোক, যা ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করবে।

পারমাণবিক ইস্যুতেও মতবিরোধ

হরমুজ প্রণালি খোলার প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আস্থা তৈরির জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং পারমাণবিক ইস্যু পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় রাখা যেতে পারে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা যাতে অস্ত্র তৈরির পর্যায়ে না পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ফলে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের জব্দ সম্পদ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি—এই বিষয়গুলোই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আবারও মার্কিন ডুবোযান জব্দের দাবি ইরানের

কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই রোববার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান জব্দ করেছে।

আইআরজিসির নৌবাহিনীর দাবি, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ডুবোযানটি আটক করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ‘রেমাস ৬০০’ ধরনের একটি স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান এবং সেটি থেকে তথ্য উদ্ধারের জন্য ইরানি বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করছেন।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতেও ইরান একটি মার্কিন স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান জব্দ করার দাবি করেছিল। সে ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ডুবোযানটি হারানোর বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছিল এবং সেটি একটি পুরোনো মডেলের যন্ত্র ও তাতে শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ছিল না বলে জানানো হয়েছিল।

তবে রোববারের নতুন ডুবোযান জব্দের দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংঘাতের পাশাপাশি কূটনীতির চেষ্টাও চলছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে।

ইরান হরমুজ প্রণালি খোলার বিনিময়ে সামরিক চাপ কমানো ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত কিছু শর্ত সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেদের শর্তে জোর দিচ্ছে।

এই অবস্থায় আরাগচির সর্বশেষ বক্তব্যে একই সঙ্গে দুই ধরনের বার্তা পাওয়া গেছে—ইরান নতুন হামলার জন্য সামরিকভাবে প্রস্তুত, আবার সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক পথও খোলা রাখতে চায়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও পরোক্ষ আলোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি, যদিও দুই পক্ষের শর্ত ও অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স