ঢাকা

গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিলবোর্ড সরানোর দাবি, ‘মবতন্ত্রের’ অভিযোগ আসিফের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার উল্লেখ করে দেশে ‘মবতন্ত্র’ কায়েমের অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। একই সঙ্গে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। গত বৃহস্পতিবার রাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

পরিদর্শন শেষে আসিফ মাহমুদের বক্তব্যের পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থানে থাকা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’ নামের একটি বিলবোর্ডও সরিয়ে ফেলা হয়। এ সময় সেখানে ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ এবং ‘মবতন্ত্রের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’—এ ধরনের স্লোগান দেওয়া হয়।

‘দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জায়গায় লুটপাট দুঃখজনক’

আসিফ মাহমুদ বলেন, সংবাদপত্রের মাধ্যমে তাঁরা রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর জানতে পারেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, স্বাস্থ্যসেবার জন্য রাখা ওষুধ ও বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করে নেওয়া হয়েছে।

এমনকি দরিদ্র শিশুদের জন্য সংরক্ষিত টিকাও লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার জায়গায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মা ও শিশুদের চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদানের মতো সেবা দিয়ে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি প্রায় ৫০ বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দরিদ্র ও অসহায় নারী-শিশুদের বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।

‘তিনটি প্রতিষ্ঠানে হামলা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়’

এনসিপির মুখপাত্র বলেন, শুধু রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই নয়, একই এলাকায় আরও দুটি স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি স্টুডিওতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দুই দিনের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায় এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ।

তবে এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রাড্ডা সেন্টারে হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশ সদস্যদের সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে একটি এক্সকাভেটরও আনা হয়েছিল।

তিনি বলেন, কোনো স্থাপনা ভাঙার অনুমতি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু ভাঙচুর শুরু হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসে বলেও মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ।

এ ঘটনায় দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে যারা ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি করেন এনসিপির এই মুখপাত্র।

সিসিটিভি ফুটেজে যেসব পুলিশ সদস্যকে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বিএনপির এমপি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততার অভিযোগ

রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির একজন সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশনের একজন কাউন্সিলর এবং স্থানীয় পুলিশের সদস্যদের সংগঠিতভাবে জড়িত থাকার অভিযোগও করেন আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের পেছনে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড রয়েছে। তাঁর দাবি, তিনি শুনেছেন ওই সমবায় সমিতির প্রধান একজন সংসদ সদস্য এবং তাঁর নেতৃত্বেই ঘটনাটি ঘটেছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি যে তথ্য তুলে ধরেছেন, সেগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া হয়নি।

এর আগে প্রথম আলোকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ বলেছেন, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে তাঁর নাম থাকলেও রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় তিনি জড়িত নন। তিনি ঘটনার আইনগত তদন্তের কথা বলেছেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণের দাবি

রাড্ডা সেন্টারের ক্ষয়ক্ষতির জন্য সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন আসিফ মাহমুদ। তাঁর দাবি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং ভবনটি পুনর্নির্মাণ করে সেখানে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে পাশের একটি মার্কেটের গলিতে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এতে বাবা-মায়েদের কষ্ট করে সন্তানদের সেখানে নিয়ে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীরাও গরমের মধ্যে সীমিত পরিবেশে টিকাদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর স্বাস্থ্যকর্মীদের খোলা জায়গায় টিকাদান কার্যক্রম চালানোর বিষয়টি এর আগেও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

আসিফ মাহমুদ বলেন, এ ধরনের অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। দরিদ্র মানুষের জন্য যে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেটি দ্রুত পুনর্গঠন করে সেবা চালুর ওপর জোর দেন তিনি।

বিলবোর্ড সরানো নিয়ে যা ঘটল

আসিফ মাহমুদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর রাড্ডা সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের পাশে থাকা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’ নামের বিলবোর্ডটি সরিয়ে ফেলা হয়। এনসিপি ও যুবশক্তির নেতা-কর্মীরা বিলবোর্ডটি খুলে ফেলে দেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাড্ডা সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলায় কারা অংশ নিয়েছিল, স্থাপনা ভাঙার অনুমোদন বা নির্দেশনা কী ছিল এবং ঘটনাস্থলে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তির দাবি উঠেছে।

আসিফ মাহমুদও দ্রুত তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স