তথ্য অধিকার আইনের আওতায় নাগরিকদের অভিযোগ দিন দিন বাড়লেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে না। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য কমিশন কার্যত কমিশনারশূন্য। ফলে অভিযোগ শুনানি ও নিষ্পত্তির পাশাপাশি তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং প্রকাশনাসহ কমিশনের বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূলত সীমিত রয়েছে কিছু নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের মধ্যে। এর ফলে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। বাংলাদেশে এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ: অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’। এ উপলক্ষে তথ্য কমিশনে একটি আলোচনা সভা আয়োজনের কথা রয়েছে।
নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া ধীর
প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগের জন্য গত ৯ জুলাই পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। তবে প্রায় আড়াই মাস পার হলেও নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, এক মাসের মধ্যে স্বাধীন তথ্য কমিশন গঠন করা হবে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে গতকাল যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাছাই কমিটি আবেদন আহ্বান করে প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। তাঁর আশা, শিগগিরই কমিশন গঠন করা সম্ভব হবে।
৮৫০টির বেশি অভিযোগ জমে আছে
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত তথ্য পাওয়ার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়া, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া কিংবা আবেদনের বিষয়ে সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন।
অভিযোগের পর কমিশন প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও শুনানি করতে পারে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, জরিমানা করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে কোনো কমিশনার না থাকায় এসব অভিযোগের শুনানি হচ্ছে না। ফলে তথ্য পাওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া নাগরিকদের আবেদনও পড়ে আছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
তথ্য কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে কমিশনে সাড়ে ৮০০টির বেশি অভিযোগ জমা রয়েছে। গত জুলাই পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৭৮০। কমিশন কার্যকর না থাকায় নতুন অভিযোগের পাশাপাশি পুরোনো অভিযোগগুলোরও নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্বহীন কমিশন
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেক এবং তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ওই বছরের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। পরে আরেক তথ্য কমিশনার মাসুদা ভাট্টিকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও নতুন কমিশন গঠন করা হয়নি। পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের বেশি সময় পর গত জুলাইয়ে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়।
আইন অনুযায়ী, প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে এই কমিটি। পরে রাষ্ট্রপতি তাঁদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেবেন।
ব্যাহত হচ্ছে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর মাধ্যমে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু দীর্ঘদিন কমিশন কার্যকর না থাকায় অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর প্রভাব নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের ওপর পড়ছে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ান-উল-আলম মনে করেন, দীর্ঘদিন তথ্য কমিশন অকার্যকর থাকায় নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থানে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের বেশি সময় পরও তথ্য কমিশন কার্যকর হয়নি। যদিও কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি করা হয়েছে, এখন দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।