কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে শিক্ষা ও কর্মজগতের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষায় শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও যোগাযোগ দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির শিক্ষকমণ্ডলী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স থেকে একাডেমিক এক্সিলেন্স’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল কবির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও আইকিউএসি সেলের পরিচালক অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম খান নাঈম।
শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয়ের তাগিদ
সেমিনারের আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেতরের জন্য প্রস্তুত করতে হবে, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বও ধরে রাখতে হবে।
তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি অনেক প্রচলিত কাজের ধরন পরিবর্তন করছে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের জ্ঞান বা ডিগ্রি অর্জন করলেই ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা, জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ, সৃজনশীলভাবে সমাধান খোঁজা এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতাও গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে তাই পরিবর্তিত কর্মবাজার ও প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
পরিচালনা পর্ষদের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম খান নাঈম। এরপর ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সদস্যদের প্রতি পরিচালনা পর্ষদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল কবির।
তিনি শিক্ষকতার দায়িত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ এবং শিক্ষকদের পেশাগত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক-প্রশাসনের সমন্বয়ের গুরুত্বও আলোচনায় উঠে আসে।
শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সম্ভাবনা, দায়িত্ব ও পেশাগত বিকাশ নিয়ে ‘শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা’ বিষয়ে বক্তব্য দেন ব্যবসায় অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবুল কালাম। একজন শিক্ষককে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, চিন্তা ও মূল্যবোধ বিকাশে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তাঁর আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থাকে পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম।
তিনি উচ্চশিক্ষার বর্তমান কাঠামো, পরিবর্তনশীল সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের শুধু প্রচলিত পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবর্তনশীল বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরীক্ষাব্যবস্থায় মান ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. জাহেদুর রহমান। পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
ভর্তি, নিবন্ধন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা
ভর্তি ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বিভাগগুলোর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. সাকির হোসেন। ভর্তি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীসেবার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয় তাঁর বক্তব্যে।
একজন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজনীয় গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করেন ইংরেজি বিভাগের প্রধান নাজলা ফাতমি। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, দায়িত্বশীলতা, পেশাগত আচরণ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাবের গুরুত্বও আলোচনায় উঠে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা নিয়ে বক্তব্য দেন মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান এ কে এম জিয়াউল আমিন। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে সুসংগঠিত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেন।
পঞ্চম শিল্পবিপ্লব ও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ
সেমিনারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ‘পঞ্চম শিল্পবিপ্লব ও উচ্চশিক্ষা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা। এতে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে উচ্চশিক্ষায় সম্ভাব্য পরিবর্তন, নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম খান নাঈম।
আলোচনায় বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
বক্তারা বলেন, ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার পাশাপাশি এমন কিছু দক্ষতার প্রয়োজন হবে, যেগুলো মানুষের সৃজনশীল চিন্তা, বিচারবোধ, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা নয়; বরং প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীল ও মানবিকভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও তৈরি করা।
মান নিশ্চিতকরণ থেকে একাডেমিক উৎকর্ষ
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিশ্চিতকরণকে শুধু মূল্যায়ন বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি পর্যায়ে ধারাবাহিক উন্নয়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের জন্য শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান যথেষ্ট নয়। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি পরীক্ষা, ভর্তি, প্রশাসন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বলতা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যক্রমে মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধারাবাহিক উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করাই একাডেমিক উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম পথ বলে আলোচনায় উঠে আসে।
প্রশ্নোত্তরে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ
সেমিনারের শেষ পর্বে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। তাঁরা একাডেমিক মানোন্নয়ন, শিক্ষকতার গুণগত বৈশিষ্ট্য, পরীক্ষা ও ভর্তি ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ নীতি এবং পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়, শিক্ষকতার মান উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়।
সেমিনারের আলোচনার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষায় মান নিশ্চিতকরণকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।