ঢাকা

তরুণদের জন্য ইউএনডিপির ফেলোশিপ, আবেদনের আগে জেনে নিন যোগ্যতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩১ কোটি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। প্রাথমিক স্তরে বই ছাপা ও সরবরাহের অগ্রগতি সন্তোষজনক হলেও মাধ্যমিক স্তরে এ কাজে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকায় নির্ধারিত সময়ে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব পাঠ্যবই পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের বইয়ের ৮৬ শতাংশের বেশি ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪ শতাংশ বই। অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরে প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ বই। বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। এ পর্যন্ত এ স্তরের মাত্র ৩ শতাংশের মতো বই সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া চারটি বইয়ের ছাপার কার্যাদেশ এখনো দেওয়া হয়নি। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় বইগুলোর অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। অনুমোদন পেলে এরপর ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

তবে এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বই ছাপা ও বিতরণের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। তাঁদের লক্ষ্য, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করে সেগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানো। কিছু মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক দিন পিছিয়ে পড়তে পারে। তারপরও জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীরা সব পাঠ্যবই হাতে পাবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

প্রাথমিকের ৭৪ শতাংশ, মাধ্যমিকের ৪০ শতাংশ বই সরবরাহ

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে ছাপানো হচ্ছে ২২ কোটির বেশি বই। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার। সব মিলিয়ে বই ছাপা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছিল। তবে ছাপা শেষ হলেই বই সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় না। বাঁধাই, কাটিং এবং প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শনের মতো কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করার পর বই সরবরাহ করা হয়। এসব প্রক্রিয়া শেষে প্রাথমিক স্তরের ৭৪ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছিল। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ বই।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের অগ্রগতির এই ব্যবধান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, মাধ্যমিক স্তরে বিপুলসংখ্যক বই ছাপানো ও সরবরাহের কাজ এখনো বাকি। এর মধ্যে রয়েছে নবম-দশম শ্রেণির বই, যেগুলোর সরবরাহের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে পাঠানো। এখন পর্যন্ত বই ছাপার অগ্রগতিতে তাঁরা সন্তুষ্ট। নির্ধারিত সময়ে, অর্থাৎ জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব পাঠ্যবই তুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন।

শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই না পাওয়ার পুরোনো শঙ্কা

দেশে ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে নতুন পাঠ্যবই দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিবছর নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে বিভিন্ন সময়ে মুদ্রণ, সরবরাহ ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরপর দুই শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত সময়ে সব বই বিতরণ করা যায়নি। চলতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেও শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি, শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস সাত দিন পর শতভাগ পাঠ্যবই সরবরাহ করতে পেরেছিল এনসিটিবি। তার আগের বছর সব বই সরবরাহ করতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল।

বই পেতে এমন বিলম্বের প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনায়। পাঠ্যবই হাতে না থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, বাড়িতে পড়াশোনা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী অতিরিক্ত বই কেনার সামর্থ্য রাখে না, তাদের জন্য বিনা মূল্যের সরকারি পাঠ্যবইয়ের ওপর নির্ভরতা বেশি।

এবারও নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগে বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও এনসিটিবির কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ে বই বিতরণের বিষয়ে আশাবাদী, তবে বাকি বই ছাপা, বাঁধাই, পরিদর্শন ও পরিবহনের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।

নতুন শিক্ষাবর্ষে যুক্ত হচ্ছে চারটি বই

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বিষয়বস্তু ও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন করে চারটি বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।

চারটি বইয়ের পাঠ্যসূচি ও বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করার পর সেগুলোর ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হবে। এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। ওই সভায় বইগুলোর অনুমোদন পাওয়া গেলে ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

অর্থাৎ নতুন চারটি বইয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও মুদ্রণপ্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে। শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে এসব বই ছাপা ও সরবরাহ করতে হলে দ্রুত পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনায় পরিবর্তন

নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ও পুনর্বিন্যাস করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।

এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক নিবন্ধ যুক্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-সম্পর্কিত বর্ণনাতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে পাঠ্যবইয়ের বর্ণনা অতীতেও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে প্রচলিত পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত পাঠ্যবই এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা বইয়ে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা দেখা যাচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের উপস্থাপনা নিয়ে এমন পরিবর্তন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষার্থীদের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার সময় ঐতিহাসিক তথ্যের যথার্থতা, প্রামাণ্য দলিল এবং ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সময়মতো বই পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানো ও সরবরাহের কাজ একটি বড় প্রশাসনিক ও লজিস্টিক কার্যক্রম। বিপুলসংখ্যক বই ছাপানোর পাশাপাশি সেগুলোর মান যাচাই, বাঁধাই, কাটিং, প্যাকেজিং ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহনের কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।

প্রাথমিক স্তরে বই ছাপা ও সরবরাহের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও মাধ্যমিক স্তরে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বইয়ের কাজ বাকি রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন চারটি বইয়ের অনুমোদন ও মুদ্রণপ্রক্রিয়া যুক্ত হওয়ায় সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

এনসিটিবির লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করে মাঠপর্যায়ে পাঠানো। এ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে শুধু ছাপার কাজ শেষ করাই যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই পৌঁছেছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আগের দুই শিক্ষাবর্ষে বই বিতরণে বিলম্বের অভিজ্ঞতার পর এবার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা—নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন থেকেই যেন পাঠ্যবই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করা যায়। এখন এনসিটিবির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বাকি মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে সেই প্রত্যাশা পূরণ করা।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স