ঢাকা

নির্বাচন নিয়ে ভুল-দুর্বলতা চিহ্নিত, এবার প্রতিরোধ: জামায়াত আমির

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে কাজ করার আহ্বান শফিকুর রহমানের, উদ্বোধন করলেন ‘নাগরিক সেবা’ অ্যাপ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। ভবিষ্যতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে কাজ করার এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেছেন জামায়াতের এই নেতা।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করার আহ্বান জানান।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না আসার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ তাঁদের ভোট দিলেও সেই ভোট তাঁরা রক্ষা করতে পারেননি বলে ভোটারদের কাছ থেকে অভিযোগ শুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করে তা কাটিয়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

‘জনগণ ভোট দিয়েছে, কিন্তু তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে’

জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। জনগণ আমাদের বলে, ভোট আপনাদের দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনারা তা রক্ষা করতে পারলেন না। তখন আমাদের বলতে হয়, আমাদের দুর্বলতা ছিল।’

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে দলের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের নির্বাচনে আরও সতর্ক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় নির্বাচনে যেসব ভুল হয়েছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে হবে। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে বিষয়ে নেতা-কর্মীদের সচেতন থাকার ওপর জোর দেন তিনি।

তবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট ছিনিয়ে নেওয়ার যে অভিযোগ তিনি করেছেন, বক্তব্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরেননি। এটি জামায়াত আমিরের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থানসংক্রান্ত বক্তব্য।

সিটি নির্বাচনে দিনরাত কাজ করার নির্দেশনা

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতা-কর্মীদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে কাজ করা গেলে ভবিষ্যতের নির্বাচনে একই ধরনের ভুল এড়ানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করেন।

সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সামনে সিটি নির্বাচনে আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে ও দিনরাত একাকার করে কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এবার এগুলোর আলোকে কাজ করলে আশা করি আর ভুল হবে না।’

তিনি আরও বলেন, সিটি নির্বাচনে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আসন্ন মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে দলের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি। তাঁর মতে, নির্বাচনে সফল হতে হলে শুধু দলীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।

‘প্রতিবাদ করব, সামর্থ্য থাকলে প্রতিরোধ গড়ব’

রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা আর বসে বসে তামাশা দেখবেন না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন এবং যেখানে সামর্থ্য থাকবে, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা আর বসে বসে তামাশা দেখব না। সংগতভাবেই প্রতিবাদ করব এবং যেখানে আমাদের সামর্থ্য থাকবে, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’

আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াতের আমির।

তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিরোধের কথা বললেও কোন ধরনের কর্মসূচি বা পদ্ধতিতে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।

উদ্বোধন করলেন ‘নাগরিক সেবা’ অ্যাপ

রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের উদ্যোগে তৈরি ‘নাগরিক সেবা’ নামের একটি অ্যাপ উদ্বোধন করেন শফিকুর রহমান।

অ্যাপটি উদ্বোধনের মাধ্যমে নাগরিক সেবাসংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অ্যাপটির নির্দিষ্ট সুবিধা, সেবার ধরন কিংবা ব্যবহারকারীরা কীভাবে এটি ব্যবহার করতে পারবেন, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

মেয়র নির্বাচনে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান গোলাম পরওয়ারের

সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও বক্তব্য দেন। তিনি আসন্ন মেয়র নির্বাচনে দলের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী মেয়র নির্বাচনে শক্তিশালী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। এর মাধ্যমে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে যথাযথ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তাঁর বক্তব্যেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাংগঠনিক প্রস্তুতি, কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

দুই পর্বে অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলন

জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলন দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে ছিল নির্বাচনী অধিবেশন। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এ অধিবেশনে ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির নির্বাচনে রুকনরা ভোট দেন।

দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, রুকনরা হলেন জামায়াতের শপথধারী কর্মী। নির্বাচনে ১৩ হাজারের বেশি রুকন ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছে দলটি। নির্বাচন পরিচালনা করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন।

বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় সাংগঠনিক অধিবেশন। এতে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান।

সম্মেলনে জাতীয় নির্বাচন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং নেতা-কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

জাতীয় নির্বাচনের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের নির্বাচনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার যে আহ্বান জামায়াত আমির জানিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও জনসম্পৃক্ততা কতটা বাড়ে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। পাশাপাশি আসন্ন সিটি নির্বাচনে দলটি কীভাবে প্রার্থী, প্রচার ও স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সাজায়, তা তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স