দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
রাজধানী: দেশে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও প্রয়োজনীয় খাবার কেনার ক্ষেত্রে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। আগে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার মাসে যে পরিমাণ ডিম কিনত, এখন তা অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে আনতে হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এনসিপির প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। এ সময় তিনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এখন একজন মানুষ বাজারে গেলে একটা বা দুইটা আইটেমের বেশি সবজি কিনতে পারে না। একটা মধ্যবিত্ত পরিবার মাসে যে ডিম খেত, তা অর্ধেকের বেশি তাদের নামিয়ে আনতে হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য মধ্যবিত্তেরও ক্রয়ক্ষমতার ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে।’
দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা
বাজেট অধিবেশনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বাজেটের পর কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি বা বাড়বে না—সংসদে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষ চাপে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মহান জাতীয় সংসদে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁরা এ ধরনের মিথ্যা ও প্রতারণামূলক কথা জনগণকে বলেছেন।’
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল ও এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়েও পড়ছে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে আগের মতো বাজার করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য বাদ দিতে বা পরিমাণ কমাতে বাধ্য হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের ডিম খাওয়ার পরিমাণ অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়ার দাবির পক্ষে তিনি কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান তুলে ধরেননি। বক্তব্যটি তাঁর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও দাবি হিসেবে এসেছে।
চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে চায় এনসিপি
কারওয়ান বাজার থেকে প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি শুরু করার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীর অন্যতম প্রধান কাঁচাবাজার হওয়ায় কারওয়ান বাজারের সঙ্গে সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেচাকেনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগও শোনা যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কারওয়ান বাজার ঢাকার কাঁচাবাজার, সবজি—সবকিছুর একটা কেন্দ্র। এখানে আমরা চাঁদাবাজি, দখলদারির কথা শুনি। সে জন্য আমরা কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করছি।’
দেশের যেসব এলাকায় চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দখলদার ও সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসবের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এসব গোষ্ঠীর আধিপত্যের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এনসিপির উদ্যোগে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা এ কর্মসূচির আয়োজন করছে। কর্মসূচির প্রচারে সপ্তাহজুড়ে প্রচারপত্র বিতরণ করবে দলটি।
আইনশৃঙ্খলা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি খারাপ বলে মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, একদিকে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকেরা দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করতে চাইলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ অসহায় বোধ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান সরকারকে ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সংস্কার বাস্তবায়ন না করায় সরকারকে অগণতান্ত্রিকও বলা যায়। তাঁর মতে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঢাকার মানুষ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও দখলদারদের কারণে অসহায় হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেন।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
বর্তমান বিরোধী দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক হয়েছে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এমন বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ প্রসঙ্গে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ প্রবাদটি উল্লেখ করে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করার অভিযোগ তোলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সুস্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে কাছে টানার জন্য তারা হেন কাজ নেই, যা করেনি।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে একধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার দেশ পরিচালনা করছে। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতা এবং সরকার পরিচালনায় সমঝোতার যে অভিযোগ নাহিদ ইসলাম তুলেছেন, বক্তব্যে তার পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি। ফলে এসব বক্তব্যকে এনসিপি নেতার রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের সমালোচনা
এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার কৃতিত্ব সরকারের নয় বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, পূজাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও সেই সহযোগিতা গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের উদ্যোগে পূজার সময় সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর এ বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে পূজার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো পরিসংখ্যান বা পৃথক ঘটনার তথ্য তিনি তুলে ধরেননি।
৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ
অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জানান, আগামী ৩০ অক্টোবর বেলা তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াও বক্তব্য দেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরের মানুষকে চাঁদাবাজ, দখলদার ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে বিভিন্ন উদ্যোগ ও গণবিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে। এ সময় তিনি রাজধানীতে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারি ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বক্তব্য পর্ব শেষে নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির নেতারা কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে প্রচারপত্র তুলে দেন। আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা।
দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ব্যয় ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনঅসন্তোষের বিষয়গুলো সামনে এনে এনসিপি এ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে। তবে কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং দলটির দাবিগুলোর প্রতি জনসমর্থন কতটা তৈরি হয়, তা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হবে।