ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে জামানতের অর্থ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে নির্বাচনী বিধিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদের জন্য আলাদা প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আগামী ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে।
ইউপি নির্বাচনে এত দিন চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জামানত ছিল ৫ হাজার টাকা এবং সদস্য পদে ১ হাজার টাকা। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান পদে জামানত ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
১৬ সেপ্টেম্বর এ–সংক্রান্ত সংশোধিত বিধিমালায় সই করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।
জামানতের অর্থ বাড়ানোর পাশাপাশি তা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। এখন কোনো প্রার্থী মোট প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। আগে প্রদত্ত ভোটের এক–অষ্টমাংশ পেলেই জামানত ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল।
চেয়ারম্যান পদে থাকছে ২০ প্রতীক
আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীক থাকছে না। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জন্য ২০টি প্রতীক সংরক্ষণ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান পদে নির্ধারিত প্রতীকগুলো হলো—
কম্পিউটার
কলার ছড়ি
ঘণ্টা
ঘোড়া
চিংড়ি
জগ
টেবিল
টেবিলঘড়ি
টেলিফোন
দালান
দোতলা বাস
পাগড়ি
বেবিট্যাক্সি
ময়ূর
মোবাইল ফোন
মোটরসাইকেল
মোড়া
রেল ইঞ্জিন
সোফা
হাঁস
অর্থাৎ চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীরা এই ২০টি প্রতীকের মধ্য থেকে নির্বাচনী প্রতীক পাবেন।
সংরক্ষিত সদস্য পদে ১০ প্রতীক
ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রার্থীদের জন্য ১০টি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
আলমারি
কলস
ড্রেসিং টেবিল
পালকি
ফলের ঝুড়ি
মাইক
সেলাই মেশিন
সূর্যমুখী ফুল
হরিণ
হেলিকপ্টার
সাধারণ সদস্য পদে ১২ প্রতীক
সাধারণ সদস্য পদে প্রার্থীদের জন্য ১২টি প্রতীক রাখা হয়েছে। এগুলো হলো—
উট
কাপ–পিরিচ
ঘুড়ি
জাহাজ
টর্চলাইট
টিউবওয়েল
ট্রাক্টর
তালা
ফুটবল
বৈদ্যুতিক পাখা
বৈদ্যুতিক বাল্ব
মোরগ
এভাবে তিনটি পদে মোট ৪২টি প্রতীক সংরক্ষণ করেছে নির্বাচন কমিশন।
দলীয় প্রতীক থাকছে না
আগের ইউপি নির্বাচনব্যবস্থার সঙ্গে এবারের বড় পার্থক্য হলো দলীয় প্রতীকের ব্যবহার থাকছে না। আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতেন।
পরবর্তী সময়ে এ–সংক্রান্ত আইন সংশোধন করা হয়েছে। সেই সংশোধনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইউপি নির্বাচন বিধিমালা থেকেও দলীয় প্রতীকগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় তাই চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য—তিন পদেই নির্দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
১৫ শতাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত
নতুন বিধিমালায় প্রার্থীদের জামানত ফেরত পাওয়ার শর্তও পরিবর্তন করা হয়েছে।
আগে কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের এক–অষ্টমাংশ পেলে জামানত ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন নিয়মে সেই সীমা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো প্রার্থী মোট প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে তাঁর জামানত ফেরত দেওয়া হবে না; তা বাজেয়াপ্ত হবে।
এর সঙ্গে জামানতের মূল অর্থও বাড়ানো হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সদস্য পদে ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
ফলে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে জামানতের অর্থ আগের তুলনায় পাঁচ গুণ এবং সদস্য পদে পাঁচ গুণ বেড়েছে।
প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা ইসির
সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনী আচরণবিধি বা অন্যান্য বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো প্রার্থী নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন করলে পরিস্থিতি ও অপরাধের ধরন বিবেচনায় কমিশন তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য রাখতে কমিশনের ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর অংশ হিসেবেই এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
অনিয়ম হলে কেন্দ্রের ফল স্থগিত করতে পারবে ইসি
ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল যদি বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে গুরুতরভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন ওই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে।
প্রয়োজনে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করার ক্ষমতাও কমিশনের থাকবে।
এতে কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অনিয়মের কারণে ভোটের ফলাফল প্রভাবিত হলে সেটি পরবর্তী পর্যায়ে কমিশনের পর্যালোচনার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের কাজে বাধা দিলে শাস্তি
নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বিষয়টিও সংশোধিত বিধিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে।
কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে নির্বাচনী কাজে বাধা দিলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় দ্বিগুণ
সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনী ব্যয়ের সীমাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয় ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
তবে সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা ২ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
ফলে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যয়ের সীমা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হলেও সদস্য প্রার্থীদের ব্যয়সীমায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
ইউপি নির্বাচনে বড় পরিবর্তন
নতুন বিধিমালায় একসঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রার্থীদের জামানতের অর্থ বৃদ্ধি, জামানত ফেরতের জন্য ভোটের হার বাড়ানো, দলীয় প্রতীক বাদ দিয়ে নির্দলীয় প্রতীক চালু, নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা, অনিয়ম হলে কেন্দ্রের ফল স্থগিত ও পুনঃভোটের সুযোগ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের কাজে বাধা দিলে শাস্তির বিধান।
এ ছাড়া চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
ফলে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য যেমন নতুন আর্থিক শর্ত কার্যকর হবে, তেমনি ভোটের মাঠে আচরণ ও নির্বাচনী অনিয়মের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আগের তুলনায় স্পষ্টভাবে বাড়ানো হয়েছে।