সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা অন্যায় হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী এমন সিদ্ধান্ত চায় না। সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল এর বিরোধিতা করবে।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিট সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি একদিকে; কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁর ভাষায়, তাঁরা টাকা উপার্জনের জন্য সংসদে যাননি। জনগণের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
এমপিদের প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার প্রসঙ্গ
শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগেই জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দিয়েছিল, দলের নির্বাচিত এমপিরা সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা নেবেন না। নির্বাচনের পর তাঁরা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন।
তিনি বলেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও পরে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সংসদে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে কোনো সংসদ সদস্য এসব সুবিধা নেবেন না।
জামায়াতের আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সংযম দেখানোর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ না নেওয়াই উচিত।
নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন
সরকার এক বছরের মধ্যে এক থেকে দেড় কোটি নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলেছিল উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, বাস্তবে অনেকে কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। এ বিষয়টি গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর বক্তব্য, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখাও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেটি নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
‘জামায়াত কেন নিজের কর্মসূচি বানচাল করতে যাবে’
রাজধানী ঢাকায় যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকারি দলের নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এ বিষয়ে অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত কেন নিজের কর্মসূচি বানচাল করতে যাবে, সেটিই তাঁর প্রশ্ন।
তিনি বলেন, লংমার্চের আগে জামায়াতের পক্ষ থেকে যদি বাসে আগুন বা ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটানো হয়, তাহলে তাতে তাদের নিজেদের কর্মসূচিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের কর্মসূচিকে বানচাল করার উদ্দেশ্যে কেউ যদি এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে, তাহলে এর দায় তাদেরই নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘‘আমার আগামীকাল লংমার্চ, আমি আজকে কি ককটেল ফুটাব, বাসে আগুন দেব, ঢাকাকে অস্থির করব? এটা কোনো পাগল করবে? আমি তো চাইব যে আমার কর্মসূচি সাকসেসফুল হোক।’’
তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল অভিযোগের রাজনৈতিক জবাবের অংশ।
‘লংমার্চ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়’
১১-দলীয় জোটের লংমার্চ নিয়ে সরকারি দলের সমালোচনারও জবাব দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর লংমার্চ বা রোডমার্চ কর্মসূচি বাংলাদেশে নতুন নয়।
শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে বর্তমান সরকারি দলের নেতারাও রোডমার্চ ও লংমার্চের মতো কর্মসূচি করেছেন। কখনো এককভাবে, আবার কখনো অন্যদের সঙ্গে যৌথভাবে এ ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, এবারও জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবি নিয়ে তাঁরা মাঠে নেমেছেন। ফলে তাঁদের কর্মসূচিকে ভিন্নভাবে দেখার কারণ নেই।
সংসদে নোটিশ নিয়ে অভিযোগ
সংসদে বিরোধী দলের বিভিন্ন বিষয়ে দেওয়া নোটিশ আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জ্বালানি, সার, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশুধর্ষণ ও হত্যা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দল একাধিকবার নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু সব নোটিশ সংসদে আলোচনার জন্য নেওয়া হচ্ছে না।
জামায়াতের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও নোটিশকে সরকার গুরুত্ব না দেওয়ায় বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, সরকার বিরোধী দলের ভালো পরামর্শ গ্রহণ না করলে তাঁদের সামনে খুব বেশি বিকল্প থাকে না। চাইলে তাঁরা প্রতিবাদ হিসেবে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বের হয়ে যেতে পারেন। তবে তাঁরা সংসদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান না, কারণ তাতে সমস্যার সমাধান হবে না।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে আপত্তি
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রসঙ্গও উঠে আসে মতবিনিময় সভায়। শফিকুর রহমান বলেন, দেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। ফলে দাম বাড়ানোর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের ব্যয়ের ওপর।
তাঁর দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে নতুন করে মানুষের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা বেরিয়ে যাবে।
সরকারের পক্ষ থেকে আশপাশের কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম—এমন যুক্তি দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ওই দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয় কি না।
শফিকুর রহমান বলেন, শুধু জ্বালানি তেলের দাম তুলনা করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মানুষের আয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর সময় সেটিকে সহনীয় মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে বলা হলেও এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।
তাঁর মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির মালিক বা বাইকচালকের খরচ বাড়ে না; গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ে।
‘ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না’
নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শফিকুর রহমান গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার কম দিচ্ছেন—মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবও দেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, সাক্ষাৎকারে তিনি যে বক্তব্য দেন, অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ফটোকার্ডে তার পুরোটা থাকে না। বক্তব্যের অংশবিশেষ ব্যবহার করায় পাঠক-দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষায়, বক্তব্যের ‘‘কাটপিচ’’ করে মাঝখানের অংশ তুলে ধরলে কথার মূল বক্তব্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ ধরনের উপস্থাপনা বন্ধের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে তিনি ভবিষ্যতে সাক্ষাৎকার দিতে আগ্রহী বলে জানান।
সরকারি খরচে বিদেশ সফর করেননি
নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত সরকারি খরচে বিদেশ সফরে যাননি বলেও জানান জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক থাকতে চান।
নিজের মাসিক ভাতার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, যে ভাতা তিনি পান, সেটিও অন্য খাতে দিয়ে দেন এবং নিজে নেন না।
তাঁর জন্য বরাদ্দ করা সরকারি বাসা নিয়েও কথা বলেন তিনি। শফিকুর রহমান জানান, ওই বাসায় বিভিন্ন কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে তিনি সেখানে বসবাস করেন না।
মতবিনিময় সভায় যারা ছিলেন
মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, রফিকুল ইসলাম খান, মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), মোবারক হোসাইন, মতিউর রহমান আকন্দ ও শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা।
মতবিনিময় সভায় মূলত সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং ১১-দলীয় জোটের লংমার্চ ঘিরে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।