ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ১৭তম জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় তিন দিনব্যাপী এই কাউন্সিলের উদ্বোধন করা হয়। ‘শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হও; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও দেশীয় দালালদের উৎখাত করো’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু হওয়া কাউন্সিল চলবে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তারা ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক সংকট, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
সমাবেশের উদ্বোধন করেন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম। বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলীপ রায়ের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ফুলবাড়ী গণ–অভ্যুত্থানের সংগঠক সঞ্জিত প্রসাদ ভট্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য হেমা চাকমা।
‘গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি’
প্রধান বক্তার বক্তব্যে ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, ২০২৪ সালে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন পরবর্তী সময়ে গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর দাবি, এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ করেছেন শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা।
তিনি বলেন, গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি, বাক্স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেই আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।
ইকবাল কবীর জাহিদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে গণ–অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জ্বালানি তেলের দাম ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ইকবাল কবীর জাহিদ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু এবং নারী ও শিশুসহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকা দরকার। একই সঙ্গে জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে নিয়ে দিলীপ রায়ের মন্তব্য
সভাপতির বক্তব্যে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলীপ রায় বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজনীতির মাঠে এসেছে।
তবে তাঁর অভিযোগ, এসব দল বাংলাদেশের মেহনতি ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলছে না।
দিলীপ রায়ের বক্তব্যে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছে, সে প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
‘বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে’
ফুলবাড়ী গণ–অভ্যুত্থানের সংগঠক সঞ্জিত প্রসাদ ভট্ট বলেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ছিল না। শ্রমিক, কৃষকসহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষেরও একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল।
তাঁর দাবি, গণ–অভ্যুত্থানের পরও দেশে বৈষম্য রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও এই বৈষম্য নতুন রূপে ফিরে আসছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সঞ্জিত প্রসাদ ভট্ট বলেন, রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর না হলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে বলা যায় না। শ্রমিক-কৃষকসহ সাধারণ মানুষের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিন দিন চলবে কাউন্সিল
বুধবারের উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ১৭তম জাতীয় কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এবং ঢাকা মহানগর কমিটির নেতা-কর্মীরা এতে উপস্থিত ছিলেন।
তিন দিনব্যাপী এই কাউন্সিল ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। কাউন্সিলকে ঘিরে সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা, ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক অধিকার, বৈষম্য নিরসন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাশা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বক্তারা এসব বিষয়ে সংগঠিত আন্দোলনের ওপর গুরুত্ব দেন।