আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একই সঙ্গে দ্রুত দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে।
এছাড়া বিএনপি এবং এর সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের সব পর্যায়ের ইউনিটকে দলীয় কার্যক্রম আরও সক্রিয় ও গতিশীল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করা যায়।
শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার বিকেলে দলের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সভার সিদ্ধান্তগুলো জানানো হয়।
সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে জোর
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও বেগবান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে স্থায়ী কমিটি। এ লক্ষ্যে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা দ্রুত আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সাংগঠনিক কর্মকৌশল নির্ধারণ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি আরও সুসংহত করা সম্ভব হয়।
একই সঙ্গে দলের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি বৃদ্ধি, সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দলীয় অবস্থান জনগণের কাছে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা
সভায় সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি এবং মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন, মন্দিরের পুরোহিত, চার্চের ফাদার ও বৌদ্ধমন্দিরের সেবায়েতদের জন্য ভাতা কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গে অবস্থান
সভায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ এবং গণভোট ইস্যুতে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলে তার নিন্দা জানানো হয়। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জনগণের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের মূল্যায়ন
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে। প্রতিবেদনে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের প্রশংসা
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে সফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও জোরদার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এসব দেশের সম্ভাব্য ভূমিকারও প্রশংসা করা হয়।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ
বৈঠকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। স্থায়ী কমিটি সংশ্লিষ্ট দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
দেশে মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাফল্য
সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির মতে, এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতিফলন। একই সঙ্গে আশা প্রকাশ করা হয়, এই অর্জনের ফলে বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
শোক প্রস্তাব
সভার শুরুতে বিএনপির সাবেক দুই নেতা মিজানুর রহমান সিনহা এবং হারুন-অর-রশীদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।
যারা উপস্থিত ছিলেন
সভায় বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ভার্চ্যুয়ালি বৈঠকে অংশ নেন।