সীমান্ত পরিস্থিতি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন এবং রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্যসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক ইস্যুতে সরকারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে ১১–দলীয় ঐক্য। শনিবার বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে এসব বিষয়ে বক্তব্য দেন জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সরকার কার্যকর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, “সীমান্তে সুড়সুড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। সরকার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। আমরা প্রতিবাদ করছি, জনগণ প্রতিবাদ করছে। শুধু প্রতিবাদই করছে না; প্রতিরোধ করার জন্য বিজিবির সৈনিকদের সঙ্গে সমানতালে জনগণ লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা এই সংগ্রামী বীরদের অভিনন্দন জানাই।”
তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শফিকুর রহমান সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার রাজনৈতিক পরিণতি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে সে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণের পালস বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণের অভিপ্রায়-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে মেহেরবানি করে অবস্থান নেবেন না। নিলে কী হয়, সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে সবারই শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তিস্তার ব্যাপারে কোনো ধানাই-পানাই বুঝি না। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে।”
গণভোট বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে দল ও জোটের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জামায়াতের আমির বলেন, এ দাবি থেকে তারা সরে আসবেন না।
তিনি বলেন, “আমাদের বিভিন্নভাবে গণভোট বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা জাতির সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না। জাতিকে আমরা কথা দিয়েছি, গণভোট বাস্তবায়নের জন্য আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। এর থেকে এক চুলও সরব না। আবু সাঈদের রক্তে ভেজা রংপুরে দাঁড়িয়ে আবারও সেই অঙ্গীকার করছি।”
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নাহিদ ইসলামের মন্তব্য
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। বক্তব্যে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে আসার পরিকল্পনা করছে। আমরা ফাঁসির দড়ি রেডি করে অপেক্ষা করছি। আপনি ডিসেম্বরে আসুন আর যখনই আসুন, ফাঁসির দড়িতে ঝুলতেই হবে। বাংলাদেশ থেকে যে পালিয়ে যায়, সে আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসে না।”
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা হবে কি না, সেটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন এবং কিছু গণমাধ্যমও সেই প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করছে। তিনি দাবি করেন, দেশের জনগণ এমন পরিস্থিতি মেনে নেবে না।
চীন সফর নিয়ে সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর প্রসঙ্গেও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সফর থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কিংবা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অঙ্গীকার পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, “চীন সফরের অর্জন কোথায়? অর্জন হচ্ছে শূন্য। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কোনো কমিটমেন্ট পাইনি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। দেশে যদি জাতীয় ঐক্য না থাকে, তাহলে পৃথিবীর কোনো দেশ থেকেই কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হবে।”
রংপুরে উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ
রংপুর বিভাগের উন্নয়ন প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরেই রংপুর অঞ্চল আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার। গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে এ অঞ্চলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটেও রংপুর বিভাগ কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এই বিভাগের অধিকাংশ সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “সরকারি দলের এমপিরা যে বরাদ্দ পান, বিরোধী দলের এমপিরা তার তিন ভাগের এক ভাগও পাচ্ছেন না। সংসদে আমরা বলেছি, আমাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে আমাদের বেতন বন্ধ করুন, কিন্তু জনগণের প্রাপ্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করার অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি।”
বিভিন্ন দলের নেতাদের বক্তব্য
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম।
এর আগে সমাবেশের শুরুতে বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান, সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক, এনসিপির রংপুর জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগরের সদস্যসচিব আবদুল মালেকসহ ১১–দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতারা।
সমাবেশে নেতারা সীমান্ত নিরাপত্তা, তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ, রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণ এবং গণভোট-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।