যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের মাহশাহর এলাকায় একটি কৃষি সেচ পাম্পকেন্দ্রে মার্কিন হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে সামরিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছে উভয় পক্ষ, যা পারস্য উপসাগরজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক ডেপুটি গভর্নর ভালিউল্লাহ হায়াতি জানান, সোমবার দিবাগত রাতের প্রথম প্রহরে মাহশাহরের কৃষি সেচ পাম্পকেন্দ্রে একটি ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ বস্তুর আঘাত হানে। এতে পাম্পকেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি নিহত হন এবং আরও চারজন আহত হন।
তিনি জানান, আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন চিকিৎসক ও জরুরি সেবাকর্মীরা।
খুজেস্তানের আটটি স্থানে হামলার দাবি
আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেওয়া বক্তব্যে ভালিউল্লাহ হায়াতি বলেন, গত কয়েক ঘণ্টায় খুজেস্তান প্রদেশের অন্তত আটটি স্থানে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ১টা ৩৫ মিনিট থেকে ২টা ২০ মিনিটের মধ্যে কয়েক দফায় এসব হামলা সংঘটিত হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শুধু খুজেস্তান নয়, দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের আরও কয়েকটি এলাকায় হামলা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং ইরাক সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা।
এদিকে আইআরএনএ জানিয়েছে, হামলার সময় বন্দর আব্বাসে অন্তত দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে বিস্ফোরণের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
নতুন দফায় হামলার কথা জানাল সেন্টকম
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আগের রাতের বড় ধরনের হামলার ধারাবাহিকতায় আবারও ইরানে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স আল–জাজিরাকে বলেন, গত এক ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গুলি চালিয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, পরিস্থিতির জবাবে মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত সেন্টকমের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আগের রাতে প্রায় ১৪০টি হামলা পরিচালনার পর রোববার রাত ৯টা (জিএমটি) থেকে আবার নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা হয়।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা
পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালানোর দাবি করে। একই সঙ্গে তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি একাধিকবার হামলার মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন পক্ষ দাবি করেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরোপিত বিধিনিষেধ এবং চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে প্রতিরক্ষামূলক বলে দাবি করলেও সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, দ্রুত সংলাপের উদ্যোগ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।