যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার জবাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান। রোববার পরিচালিত এ হামলার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চললেও রোববারের হামলার ব্যাপ্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। ইরান এবার শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাই নয়, সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধিও আরও বিস্তৃত করেছে।
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও উত্তেজনা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ হামলার প্রভাব কাতার পর্যন্ত পৌঁছেছে। দেশটি এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিল। গত এপ্রিলের পর কাতারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো নিরাপত্তা ঘটনা ঘটেনি। তবে সর্বশেষ হামলা সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমার দিকে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গত মে মাসের শুরু থেকে আমিরাতের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন এই হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের হামলার পরপরই পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ও বেসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ওই পথে হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করে দিতে রোববার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা থেকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প: ‘আমরা ওদের ওপর তীব্র আঘাত হানছি’
রোববার বিকেলে রয়টার্সকে দেওয়া সংক্ষিপ্ত এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের বিষয়ে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আমরা ওদের ওপর তীব্র আঘাত হানছি।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। এর আগে গত সপ্তাহেও তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
ইরানে বিস্ফোরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর
ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রোববার বন্দর আব্বাস এবং এর কাছাকাছি কেশম দ্বীপের আশপাশে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব হামলায় হতাহতের সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নৌঘাঁটির নিকটবর্তী এসব এলাকায় হামলা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ওই চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ধাপে ধাপে সামরিক সংঘাত কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ফলে সেই উদ্যোগ কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাবের শঙ্কা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অবরোধ ও চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও গভীর
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। একদিকে ইরান মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকা দেশগুলোতে হামলা জোরদার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ধারাবাহিকভাবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সংলাপ শুরু না হলে বর্তমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।