ঢাকা

ভূমধ্যসাগরীয় পাইপলাইন চালুর উদ্যোগ, হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় সিরিয়া–ইরাক–যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানির জন্য একটি বিকল্প করিডোর গড়ে তুলতে ইরাক, সিরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ কিরকুক–বানিয়াস তেল পাইপলাইন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে। ইরাকের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই–এর এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করা গেলে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কিরকুক থেকে সরাসরি সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত তেল পরিবহন সম্ভব হবে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং ইরানের কৌশলগত প্রভাবও সীমিত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ধারণা।

ট্রাম্প–জাইদি বৈঠকে আসতে পারে বড় ঘোষণা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির বৈঠকে এই পাইপলাইন পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি সমঝোতা বা চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।

এর আগে চুক্তির বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক।

ইরাকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে টম বারাকের কার্যকর কর্মসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বারাক এই পাইপলাইনকে লেভান্ট অঞ্চলের (পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা) ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অবকাঠামো উন্নয়নের একটি আদর্শ মডেল হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া একটি পাইপলাইন

কিরকুক–বানিয়াস পাইপলাইনটি ১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি নির্মাণ করে। প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা নিয়ে এটি সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ছিল।

তবে ১৯৮০-এর দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধ চলাকালে সিরিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বাগদাদ সরকার পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

পরবর্তীতে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযানের সময় পাইপলাইনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে এটি অচল অবস্থায় রয়েছে।

নতুন বাস্তবতায় ইরাক–সিরিয়া সম্পর্ক

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক স্বতন্ত্র বিশ্লেষক সারহাং হামাসাইদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ইরাক এখন সিরিয়াকে আগের তুলনায় ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে।

তাঁর ভাষায়, “যুদ্ধের আগে ইরাকের মধ্যে সিরিয়াকে নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে যে, আঞ্চলিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য সিরিয়াকে এখন ইরাকের প্রয়োজন।”

আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইন-সংক্রান্ত সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি যুক্তরাষ্ট্র সফর করতে পারেন।

সিরিয়ার নতুন কূটনৈতিক অবস্থান

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিয়ার বর্তমান নেতৃত্বকে ঘিরে আঞ্চলিক কূটনীতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

ইরাক সরকারের ওপর শিয়া রাজনৈতিক দল ও ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর প্রভাব থাকলেও তারা এখন বাস্তবতার কারণে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনা করছে।

এক দশক আগে আল-কায়েদার সিরীয় শাখা আল-নুসরা ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত থাকা আহমেদ আল-শারা (শারা) পরবর্তীকালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বলয়ে প্রবেশ করেন। বর্তমানে তিনি তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের সমর্থন পাচ্ছেন।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে শারার সাবেক সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)–এর ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শারার প্রশংসা করে তাঁকে “অসাধারণ” এবং “উচ্চ সম্মানের ব্যক্তি” বলে উল্লেখ করেন।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ১৯৭৯ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকায় থাকা সিরিয়াকে সেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণের পথ সুগম

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিগত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে পাইপলাইন পুনর্গঠন প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ সহজ হবে।

ইতোমধ্যে ইরাক সরকার হাদিসা ও কিরকুক থেকে সিরিয়ার বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইন পুনর্গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা অনুমোদন করেছে।

হরমুজের বিকল্প খুঁজছে ইরাক

বর্তমানে ইরাকের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল রপ্তানি হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে ওই নৌপথে সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধ সৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি ইরাক।

যদিও ইরানের সঙ্গে ইরাকের কয়েকটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তবুও হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতার কারণে দেশটির তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভোরটেক্সা জানিয়েছে, গত মে মাসে সমুদ্রপথে ইরাকের তেল রপ্তানি ছিল আগের বছরের গড় রপ্তানির মাত্র ৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি ইরাকের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ দেশটির জাতীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ রাজস্ব আসে তেল বিক্রি থেকে।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

পর্যবেক্ষকদের মতে, কিরকুক–বানিয়াস পাইপলাইন পুনরায় চালু হলে তা শুধু একটি জ্বালানি প্রকল্পই হবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে বিকল্প রপ্তানি করিডোর গড়ে উঠলে ইরাকের জ্বালানি রপ্তানি আরও স্থিতিশীল হবে, সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স