ঢাকা

মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু: কেন শোক প্রকাশ করছে ইসরায়েল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগ এবং দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। তাঁরা গ্রাহামকে ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দৃঢ় সমর্থক এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা হিসেবে স্মরণ করেছেন।

রয়টার্স ও আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন লিন্ডসে গ্রাহাম। তাঁর মৃত্যুতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কেরই প্রতিফলন।

নেতানিয়াহু: ‘আমি হারালাম এক প্রিয় বন্ধুকে’

রোববার এক শোকবার্তায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লিন্ডসে গ্রাহাম সবসময় বিশ্বাস করতেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ইসরায়েল ও আমেরিকার নিরাপত্তা যে একই সূত্রে গাঁথা, তা লিন্ডসে বুঝতেন। ইসরায়েল তার অন্যতম সেরা বন্ধুকে হারাল। আমেরিকা হারাল একজন মহান দেশপ্রেমিককে। আর আমি হারালাম আমার এক প্রিয় বন্ধুকে।”

নেতানিয়াহুর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গ্রাহাম কেবল একজন মার্কিন আইনপ্রণেতাই ছিলেন না; বরং ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবেও বিবেচিত হতেন।

শোক জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ নেতারা

গ্রাহামের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পৃথক শোকবার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট।

তাঁরা সবাই গ্রাহামকে ‘ইসরায়েলের অকৃত্রিম বন্ধু’ এবং দেশটির অন্যতম শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় গ্রাহাম দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এছাড়া ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও পৃথক শোকবার্তায় বলেছে, “ইসরায়েলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে লিন্ডসে গ্রাহাম আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।” তাঁর মৃত্যুতে মন্ত্রণালয় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে।

কেন ইসরায়েলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন গ্রাহাম

লিন্ডসে গ্রাহামের রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইসরায়েলের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও ধারাবাহিক সমর্থন।

তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে এমন নীতির পক্ষে তিনি সবসময় অবস্থান নিয়েছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই নিরাপত্তা দর্শনের অংশ হিসেবেই তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বলে মনে করতেন। ফলে সামরিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অবস্থান শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগে তিনি নিয়মিত সমর্থন দিয়ে এসেছেন।

ইরান প্রশ্নে কঠোর অবস্থান

গ্রাহাম ছিলেন ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতির অন্যতম প্রবক্তা। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক নীতিরও তিনি প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন।

এ ছাড়া ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানেরও তিনি দৃঢ় সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তী সময়েও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য দিয়ে আসেন।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর অবস্থান ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন

লিন্ডসে গ্রাহাম ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০২০ সালে তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়ে টানা চার মেয়াদে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এর আগে ১৯৯৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং সাউথ ক্যারোলাইনার তৃতীয় কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করেন।

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও প্রাইমারি ভোট শুরু হওয়ার আগেই প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। সে সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে দুজনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় এবং ট্রাম্পের অন্যতম বিশ্বস্ত রিপাবলিকান মিত্র হিসেবে পরিচিতি পান।

সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে

রাজনীতিতে আসার আগে লিন্ডসে গ্রাহাম যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি ছয় বছরেরও বেশি সময় সামরিক আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৫ সালে তিনি বিমানবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্সে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর গ্রহণ করেন।

সামরিক, আইন ও রাজনীতিতে দীর্ঘ কর্মজীবনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কে প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজনীতিতে যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তৈরি করেছে, তেমনি ইসরায়েলের জন্যও এটি একজন দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য মিত্রকে হারানোর ঘটনা। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ইরানবিষয়ক অবস্থানে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কারণে ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স