পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতার বসতবাড়িতে বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর, মূল্যবান মালামাল লুট এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৮ জুলাই) মধ্যরাতের পর থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত চালানো এ হামলায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।
এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং এ পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
যাঁর বাড়িতে হামলা
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কাজী মিজানুর রহমান (লাভলু), যিনি মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি একই সঙ্গে ওই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। এরপর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
মির্জাগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালতলী বাজারসংলগ্ন উত্তর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তাঁর বসতবাড়িতে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
‘বুলডোজার দিয়ে ঘর ভেঙে লুটপাট, এরপর আগুন’
কাজী মিজানুর রহমানের স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পী অভিযোগ করেন, বৃদ্ধা শাশুড়ির অসুস্থতার কারণে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাঁরা ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। সেই সুযোগে গভীর রাতে শতাধিক লোক তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়।
তাঁর দাবি, মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান (পলাশ হাওলাদার) এবং সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের নেতৃত্বে প্রায় আড়াই শতাধিক ব্যক্তি বুলডোজার দিয়ে পাকা ভবনটি ভেঙে ফেলেন।
তিনি বলেন, বাড়ি ভাঙার আগে ও পরে ঘরে থাকা চারটি রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, একাধিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), স্বর্ণালংকারসহ প্রায় সব মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া সামগ্রীর মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা।
এরপর ছয় কক্ষবিশিষ্ট প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যমানের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে ভবনের অবশিষ্ট অংশও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভিডিও ধারণেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ
মেহেরুন্নেছা শিল্পী জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে শনিবার ভোরে বাড়িতে পৌঁছান। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, হামলার আগে কাঁঠালতলী বাজার ও আশপাশের এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বলা হয়।
এছাড়া কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তাঁদের ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তাঁদের বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ি অবস্থিত। গভীর রাতে বুলডোজারের শব্দ শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও হামলাকারীরা ধাওয়া দিলে নিরাপত্তার কারণে পুলিশ সদস্যরা সেখান থেকে সরে যান বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন।
এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য
মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম জানান, শনিবার সকাল ৬টা ৮ মিনিটে খবর পেয়ে তাঁদের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়।
তিনি বলেন, সেখানে পৌঁছে দেখা যায় কাজী মিজানুর রহমানের বসতঘরে আগুন জ্বলছে এবং ভবনের সামনের অংশ ভেঙে পড়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা চারটি কক্ষে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আওয়ামী লীগ নেতার প্রতিক্রিয়া
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কাজী মিজানুর রহমান বলেন, নিজের কেনা জমির ওপর তিনি বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন।
কী কারণে তাঁর বাড়িতে হামলা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যাঁরা আমার বাড়ি ভাঙায় জড়িত, তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই।’
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী হামলায় জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, শুক্রবার তিনি ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরেছেন এবং ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন না।
অভিযুক্ত ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মনির খন্দকার সরাসরি হামলার দায় স্বীকার না করলেও দাবি করেন, কাজী মিজানুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরির জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন এবং বিষয়টি ভূমি অফিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা না নিয়ে নিজেরা কেন বাড়ি ভাঙলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অতীতে বিএনপি প্রশাসন ব্যবহার করেনি। তাঁর দাবি, ৫ আগস্টের পর চাইলে তখনই বাড়িটি ভেঙে ফেলা যেত, কিন্তু তা না করে পাহারা দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পুলিশের বক্তব্য
মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, ভোররাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা মিজানুর রহমানের বাড়িতে আগুন দেয় এবং একটি খননযন্ত্র (বেকু) দিয়ে ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার সময় বাড়িতে কেউ না থাকায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএনওর বক্তব্য
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেল জানান, ভোররাতে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
তিনি বলেন, সেখানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
ইউএনও জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়িকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।