গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে বর্তমান সরকারকে জনগণের সরকার হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “গণভোট ব্যর্থ হলে এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে।”
শনিবার বিকেলে বরিশাল নগরের বান্দ রোডে কে বি হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ১১–দলীয় ঐক্যজোট আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বৈরী আবহাওয়া ও থেমে থেমে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলীয় নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন। দুপুর ২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হলেও দুপুর ১২টার পর থেকেই সমাবেশস্থলে জনসমাগম বাড়তে থাকে।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে জনগণ সরকারকে মেনে নেবে না’
বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের জন্য নতুন শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার গণভোটের রায়ের বিষয়টি উপেক্ষা করছে।
তিনি বলেন, “মেকানিজমের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে তারা গণভোটের রায় ভুলে গেছে। জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না হলে এই সরকারকে জনগণের সরকার হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না।”
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, গণভোটের প্রশ্নে সরকার ভুল পথে রয়েছে। দ্রুত সেই অবস্থান থেকে সরে এসে জনগণের রায় কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ২৫ জুলাই সিলেটে অনুষ্ঠেয় সমাবেশের আগেই সরকারকে এ দাবি মেনে নিতে হবে। অন্যথায় রাজধানী ঢাকায় বৃহত্তর কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
‘ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন’
বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ইঙ্গিত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে এমন একজন ‘অবৈতনিক শিক্ষক’ রয়েছেন, যিনি প্রায়ই সংবিধান নিয়ে বক্তব্য দেন। কিন্তু জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে তার পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তাঁর অভিযোগ, সরকার এমন পথে এগোচ্ছে, যা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এটি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের দাবি
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়ও তুলে ধরেন জামায়াত আমির।
তিনি ভোলা জেলার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ নিশ্চিত করতে একটি সেতু নির্মাণ এবং দক্ষিণাঞ্চলে রেলপথ সম্প্রসারণের দাবি জানান।
তাঁর ভাষ্য, বরিশালকে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়।
‘প্রয়োজনে আবার আন্দোলনে নামতে হবে’
সরকারের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে দায় এড়ানো যাবে না।
তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে মানুষ জীবন দিয়েছে, কিন্তু মাথা নত করেনি। জনগণ যখন প্রকৃত ফ্যাসিবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন ডামি ফ্যাসিবাদকেও প্রত্যাখ্যান করবে।”
তিনি আরও বলেন, রাজপথের পরিবর্তে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চান। তবে জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে আবারও আন্দোলনের পথেই যেতে হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছে। কেবল ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে মানুষ হাতে চিড়া-মুড়ি নিয়েই আবারও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আবারও গণ–অভ্যুত্থান’
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না হলে আবারও গণ-অভ্যুত্থানের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত হরতাল বা অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী যেকোনো সময় এমন কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।
‘নির্বাচনের আগে এক কথা, পরে আরেক’
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে সরকারপ্রধান গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর জনগণের রায়ের প্রতিফলন অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “মুখে জুলাই সনদের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণ সরকারকে ক্ষমতা দিয়েছে মানে এই নয় যে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা যাবে।
বিএনপির আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন
নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির আন্দোলন মূলত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না; বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য, গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে অংশ নিয়েছিল। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা সংস্কার বা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার প্রথম প্রস্তাব ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতিও উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নতুন সংবিধানের দাবিও তুললেন নাহিদ
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, সংবিধান সংস্কারের নামে কোনো প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না।
প্রয়োজনে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং নতুন গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলারও ঘোষণা দেন তিনি।
একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সংস্কার, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দমন এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের সমালোচনা
বরিশালের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ মাস অতিক্রম হলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি; বরং ছাত্রদল, যুবদল ও কৃষক দলের চাঁদাবাজি বেড়েছে।
বিভিন্ন দলের নেতাদের অংশগ্রহণ
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।
এতে বক্তব্য দেন এবি পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ফুয়াদ), বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতুসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
এলডিপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য
সমাবেশে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটি রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেছে এবং ভবিষ্যতে আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে না বলে তাঁর অভিমত।
ভারত প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। তবে এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে উসকানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণভোটের রায়, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সংকট এবং দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতামত ও দাবি।