ঢাকা

আলোচনা সভায় বক্তারা: আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর রাজনীতির আহ্বান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৃষ্টি হওয়া নতুন বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির ভূমিকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। বক্তারা বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হলে যুক্তি, চিন্তা ও সাংগঠনিক শক্তির মাধ্যমে তা করতে হবে; গালাগালি বা বিদ্বেষমূলক ভাষা দিয়ে নয়। একই সঙ্গে তাঁরা মত দেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামপন্থী দলগুলোর সক্রিয়ভাবে ফিরে আসা গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাভাবিক একটি বিষয়।

শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে ‘জুলাই-উত্তর রাজনীতি: গতি ও গত্যন্তর’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক প্রভাব, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

‘আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে’

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, গত দেড় দশক ধরে বিএনপির আন্দোলনের চারটি প্রধান দাবি ছিল—দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা, দলীয় নেতা-কর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন।

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব দাবির বাস্তবায়ন হয়েছে। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দলটি নিষিদ্ধ ছিল, তাদের কার্যালয় বন্ধ ছিল এবং অনেক নেতা কারাগারে বা আত্মগোপনে ছিলেন। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তাদের জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশ হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে এবং সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখেন।

আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে হবে যুক্তি, চিন্তা ও রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে; গালাগালি দিয়ে নয়।’

জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, তাঁর মতে বর্তমানে ‘জুলাই-শক্তির মধ্যে অনৈক্য, বিজয়ীদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং পরাজিতদের ফিরে আসার আস্ফালন’—এই তিনটি বিষয় দেশের রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

‘ইসলামপন্থীদের রাজনীতিতে ফেরা গণতন্ত্রে স্বাভাবিক’

আলোচনা সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থার রাজনীতি আবার ফিরে এসেছে। পাশাপাশি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও নতুন করে রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় হয়েছে।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক, তবে তাদের রাজনীতি করার অধিকার অস্বীকার করা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সারোয়ার তুষারের ভাষ্য, ‘ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনীতির বিরোধিতা করা যেতে পারে, কিন্তু তাদের রাজনীতি করার অধিকার অস্বীকার করা যায় না।’

তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এখনো একটি চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাঁর দাবি, অভ্যুত্থানের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং তা ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র তৈরির চেষ্টা চলছে। সে কারণে এই অর্জন রক্ষায় এখনো রাজনৈতিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।

জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি গণতান্ত্রিক দলিল। তাঁর মতে, এতে ফ্যাসিবাদী বা উগ্র ডানপন্থী কোনো উপাদান নেই; বরং বিশ্বের উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী এটি একটি গণতান্ত্রিক নথি।

‘৫ আগস্ট রাতেই আন্দোলন হাইজ্যাক করা হয়েছিল’

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করে বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর ওই রাতেই ছাত্র-জনতার আন্দোলন ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছিল।

তিনি জানান, সেদিন বঙ্গভবনে আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন বা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব সেখানে ছিল না। বরং আগে থেকেই পরিকল্পিত একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

আজিজুল হক ইসলামাবাদী অভিযোগ করেন, তাঁর দৃষ্টিতে ৫ আগস্টের দিনই জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাঁরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সমর্থন করেছিলেন। তবে তাঁর দাবি, প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পাওয়া যায়নি এবং সরকার পূর্ববর্তী প্রভাববলয় থেকে বের হতে পারেনি।

জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে মতবিনিময়

আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও আগ্রহী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা তাঁদের নিজ নিজ রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সভায় উপস্থাপিত বক্তব্যগুলো সংশ্লিষ্ট বক্তাদের নিজস্ব মতামত।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স