ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে পার্লামেন্টের শেষ অধিবেশনে একের পর এক বিতর্কিত আইন পাস করিয়েছে। বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ, সংসদকক্ষে বিক্ষোভ, সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য আপত্তি এবং আদালতের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা সত্ত্বেও সরকার আইনগুলো অনুমোদন করাতে সক্ষম হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নির্বাচনের আগে অতি রক্ষণশীল হারেদি ও কট্টর ডানপন্থী শরিকদের সন্তুষ্ট রেখে ক্ষমতার জোট অটুট রাখাই ছিল নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য।
সংসদে উত্তেজনা, নেতানিয়াহুকে ‘পদত্যাগ’ স্লোগান
গত মঙ্গলবার নেসেটে (ইসরায়েলের পার্লামেন্ট) অধিবেশন চলাকালে বিরোধী দলের একাধিক আইনপ্রণেতা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
সংসদকক্ষে তাঁরা বারবার ‘লজ্জা’, ‘পদত্যাগ করুন’ এবং ‘চলে যান’—এমন স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে নেতানিয়াহু ভোটাভুটিতে অংশ না নিয়েই সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন।
তবে তাঁর অনুপস্থিতি সরকারের আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। জোটের সংসদ সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিতর্কিত বিলগুলো পাস করিয়ে নেন।
নির্বাচনের আগে জোট ধরে রাখার কৌশল
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে সরকার দ্রুত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত আইন পাস করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব আইনের বেশির ভাগই নেতানিয়াহুর জোটের প্রধান অংশীদার—অতি রক্ষণশীল হারেদি দল ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি।
তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌশল ছিল জোটসঙ্গীদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো পূরণ করা। মেয়াদের শেষ সপ্তাহে তড়িঘড়ি করে আইন পাস করানোর মধ্যেও সেই কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাদাভ ইয়াল লিখেছেন, বর্তমানে নেতানিয়াহুর মূল লড়াই রাজনৈতিক টিকে থাকার। আর সেই লড়াইয়ে হারেদি গোষ্ঠীর সমর্থন তাঁর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৮ সালের পর বিরল রাজনৈতিক মাইলফলক
ব্যাপক গণবিক্ষোভ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মতো নানা সংকটের মধ্যেও নেতানিয়াহুর সরকার একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ইসরায়েলি সরকার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করল।
দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও এর আগে নিজেও কখনো পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি নেতানিয়াহু।
হারেদিদের সামরিক ছাড় নিয়ে বিতর্ক
ইসরায়েলের সবচেয়ে আলোচিত আইনগুলোর একটি ছিল হারেদি সম্প্রদায়ের জন্য সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের বিষয়ে বিশেষ সুবিধা বহাল রাখার উদ্যোগ।
ইসরায়েলের আইনে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে অধিকাংশ নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বহু বছর ধরে ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত হারেদি পুরুষদের এ বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়ে আসছে।
সুপ্রিম কোর্ট কয়েকবার এ ব্যবস্থা বাতিলের নির্দেশ দিলেও রাজনৈতিক কারণে বিষয়টি ঝুলে ছিল।
গাজা যুদ্ধের পর এ বিতর্ক আরও বেড়েছে। কারণ, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি, তাদের অন্তত ১২ হাজার অতিরিক্ত সেনা প্রয়োজন।
কিন্তু সেনাবাহিনীতে যোগদানের বয়স হলেও প্রায় ৭২ হাজার হারেদি তরুণ এখনো বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্বে যোগ দেননি।
ফলে যুদ্ধের বাড়তি চাপ সামলাতে নিয়মিত ও রিজার্ভ সেনাদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরাসরি ছাড় নয়, নেওয়া হলো বিকল্প পথ
নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছিলেন, হারেদিদের জন্য স্থায়ী সামরিক ছাড়ের আইন সরাসরি পাস করালে জনমতের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
সে কারণে সরকার বিকল্প কৌশল নেয়।
এর অংশ হিসেবে একটি আইনে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে তাওরাত অধ্যয়নের অজুহাতে হারেদিদের সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইনি ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ছাড়া আরেকটি আইনে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়া কয়েক হাজার হারেদি তরুণকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাময়িক আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালন না করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
সেনাপ্রধানের বিরল প্রকাশ্য আপত্তি
ভোটাভুটির আগে আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির প্রকাশ্যে এ আইনগুলোর বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে এ আইন মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাঁর ভাষায়, এ ধরনের আইন বাধ্যতামূলকভাবে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি সৃষ্টি করবে এবং সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থাও ক্ষুণ্ন করতে পারে।
সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যে নেতানিয়াহুর জোটসঙ্গীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।
ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতা ইয়াল জামিরকে অপসারণের দাবি জানান। আর হারেদি রাজনৈতিক দল শাস–এর চেয়ারম্যান আরিয়েহ দেরি অভিযোগ করেন, সেনাপ্রধান সামরিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন।
আদালতের স্থগিতাদেশ
সংসদে আইনটি পাস হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিরোধী দলগুলো হাইকোর্টে আবেদন করে।
এরপর আদালত আইনটির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।
ফলে বিষয়টি এখন বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।
বিচারব্যবস্থা সংস্কারেও অগ্রগতি
সরকার মেয়াদের শেষ দিকে বিচারব্যবস্থা সংস্কার–সংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনও পাস করেছে।
এই আইনের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, আইনটি কার্যকর হলে সরকার আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত উপেক্ষা করতে পারবে।
এ ছাড়া বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের পথও আবার উন্মুক্ত হতে পারে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট সে উদ্যোগ আটকে দিয়েছিল।
গণমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও বিতর্ক
এ সপ্তাহেই সম্প্রচার-সংক্রান্ত আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন আইনের ফলে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের একটি আইনও পাস হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও নারীর অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এ আইন নারীদের প্রতি বৈষম্যকে উৎসাহিত করবে এবং উচ্চশিক্ষায় সমতার পরিবেশ দুর্বল করবে।
পশ্চিম তীরে নতুন বসতি সম্প্রসারণ
সরকারের আরেক জোটসঙ্গী, উগ্র ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ ঘোষণা করেছেন।
এ পরিকল্পনায় নতুন আবাসন ও সড়ক নির্মাণে প্রায় ২৪০ কোটি শেকেল (প্রায় ৭৯ কোটি মার্কিন ডলার) ব্যয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আগে স্থাপিত ৩৪টি নতুন অবৈধ বসতিকেও বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
স্মোট্রিচের দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পশ্চিম তীরে অনুমোদিত নতুন বসতির সংখ্যা বেড়ে ১০৪টিতে পৌঁছেছে।
জনমত সরকারের বিপক্ষে
তবে এসব আইন সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা জনপ্রিয়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জুলাই মাসে টেলিভিশন চ্যানেল ১২–এর এক জরিপে দেখা গেছে—
৬৬ শতাংশ ইসরায়েলি তাওরাত অধ্যয়নকে মৌলিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।
৬১ শতাংশ মনে করেন, পরবর্তী সরকারে হারেদি রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকা উচিত নয়।
এই জনমতকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম ইস্যুতে পরিণত করেছে।
বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা
বর্তমান জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসা ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট সরকারের সমালোচনা করে বলেন, রাষ্ট্রের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কেবল রাজনৈতিক জোট টিকিয়ে রাখতেই এসব সমঝোতা করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সরকারের পদক্ষেপকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন।
তাঁর মতে, সরকার সেনাসদস্য, তাঁদের পরিবার এবং দেশের মানুষের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছে। তিনি একে অত্যন্ত নিম্নমানের এবং জায়নবাদবিরোধী রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
আদালতের সঙ্গে নতুন সংঘাতেও প্রস্তুত নেতানিয়াহু
এসব সমালোচনা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন বলে মনে করছেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা।
লিকুদ পার্টির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মানুষের স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী। সাময়িক বিতর্কের চেয়ে নির্বাচনের আগে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জোট ধরে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর ভাষায়, বিচারব্যবস্থা সংস্কার, ৭ অক্টোবরের হামলা কিংবা দীর্ঘ যুদ্ধের পরও যারা নেতানিয়াহুর পাশে থেকেছেন, তাঁরা এখন সহজে তাঁকে ছেড়ে যাবেন না।
এ ছাড়া আদালত যদি এসব আইনে হস্তক্ষেপও করে, সেটিকে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে পারেন বলে মনে করছেন তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের মতে, বিচারব্যবস্থার সঙ্গে নতুন সংঘাত তৈরি হলে আদালতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন প্রধানমন্ত্রী, যা নির্বাচনের আগে তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।