নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বালু ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেনকে অপহরণ করে মারধর এবং তাঁর কানে কামড় দেওয়ার অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ দাবি করেছে বিএনপি। এ ঘটনায় দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন চিশতিয়াকে জড়িয়ে যে মামলা হয়েছে, তা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
অন্যদিকে, মামলার বাদী ও জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি মিয়া মোহাম্মদ সজিব অভিযোগ করেছেন, মামলা দায়েরের পর থেকেই তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার ভোরে তাঁর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে আসবাবপত্র, বই ও রাজনৈতিক নেতাদের ছবি পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁর ১৫টি পোষা পাখি আগুনে মারা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির দাবি
শনিবার দুপুরে ঘোড়াশাল পৌর বিএনপির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের পৌর সভাপতি আলম মোল্লা বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘কানে কামড়’ দেওয়ার ঘটনা তারা যাচাই-বাছাই করেছেন এবং তাঁদের মতে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মহিউদ্দিন চিশতিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।
তিনি দাবি করেন, একটি পক্ষ ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থে মহিউদ্দিন চিশতিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
আলম মোল্লা বলেন, বর্তমান সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণত আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। তাঁর ভাষায়, একজন বিএনপি নেতা কারও কানে কামড় দেবেন—এমন অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, পূর্বের একটি ঘটনার জেরে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। পরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতারা জানান, মামলাটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোকাবিলা করা হবে।
কী অভিযোগ ছিল
মামলার নথি অনুযায়ী, গত সোমবার সন্ধ্যায় পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে বাংলাদেশ জুট মিলের সামনে থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা বালু ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেনকে তুলে নেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, তাঁকে ঘোড়াশাল পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন চিশতিয়ার বাড়িতে নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে কিল-ঘুষি ও চড়-থাপ্পড়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মহিউদ্দিন চিশতিয়া তাঁর গলা চেপে ধরে কানে কামড় দেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে তাঁর কানে চারটি সেলাই দিতে হয়।
ঘটনার পর গত মঙ্গলবার রাতে ঠিকাদার ও জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি মিয়া মোহাম্মদ সজিব বাদী হয়ে মহিউদ্দিন চিশতিয়াসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
চাঁদা দাবির অভিযোগ
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, টি কে খান গ্রুপের একটি প্রকল্পে বালু, ইট, রড ও সিমেন্ট সরবরাহের কাজ পান মিয়া মোহাম্মদ সজিব। সেই প্রকল্পে বালু সরবরাহের জন্য তিনি সাখাওয়াত হোসেনের কাছ থেকে একটি ড্রেজার মেশিন ও পাইপ ভাড়া নেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ জুট মিলসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ড্রেজার ও পাইপ বসানোর সময় মহিউদ্দিন চিশতিয়ার নির্দেশে কয়েকজন ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে সাখাওয়াত হোসেনের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে মহিউদ্দিন চিশতিয়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে উঠানে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধরের পর তাঁর গলা চেপে ধরে কানে কামড় দিয়ে কান ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে বাড়ির বাইরে ফেলে রেখে চলে যান অভিযুক্তরা।
মামলার বাদীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ
এরই মধ্যে শনিবার ভোরে মামলার বাদী মিয়া মোহাম্মদ সজিবের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
তিনি অভিযোগ করেন, মামলা দায়েরের পর থেকেই তাঁকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ভোরের দিকে দুর্বৃত্তরা তাঁর কার্যালয়ের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এতে শতাধিক বই, দেয়ালে টাঙানো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি, চেয়ার-টেবিল, সোফাসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র পুড়ে যায়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হিসেবে তিনি জানান, কার্যালয়ে রাখা তাঁর ১৫টি বিভিন্ন জাতের পোষা পাখি আগুনে পুড়ে মারা গেছে।
ঘটনার জন্য তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময়ও এমন হামলার শিকার হইনি। জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি হয়েও বিএনপি নেতার ক্রোধের আগুনে পুড়ে গেলাম।’
ঘটনাস্থলে যা দেখা গেছে
শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনশেড ঘরে মিয়া মোহাম্মদ সজিবের কার্যালয়। ঘরের একটি জানালার গ্রিল ভাঙা। ভেতরে পুড়ে যাওয়া চেয়ার-টেবিল, সোফা, নেতাদের প্রতিকৃতি এবং বইয়ের তাকজুড়ে শতাধিক দগ্ধ বই পড়ে রয়েছে।
ঘরের এক কোণে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ১৫টি পোষা পাখির মৃতদেহও দেখা যায়।
পুলিশের বক্তব্য
পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহেদ আল মামুন বলেন, মামলার বাদীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের বিষয়টি তিনি জেনেছেন।
তিনি জানান, এ ঘটনায় এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেনকে মারধর ও কানে কামড় দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্তও চলমান রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এদিকে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে বিএনপি অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলছে, অন্যদিকে মামলার বাদী হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলেছেন। ফলে ঘটনাটিকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।