ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতে নতুন মোড়, যুদ্ধ আবার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা নতুন মাত্রা পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানের সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং সৌদি আরবে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।

নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ইরানে অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০–এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ভেঙে পড়ার পর দুই দেশের সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তা দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে গেল

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল।

চুক্তিতে উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ শিথিল করা এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।

তবে ওই বৈঠকের পরপরই আবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। গত কয়েক দিনে বিচ্ছিন্নভাবে চলা হামলা শনিবার টানা সপ্তম দিনে গড়ায়।

ট্রাম্প: সমঝোতা আর মানবে না যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন আর সমঝোতা স্মারকের শর্ত মেনে চলবে না।

শনিবার ইরানও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করায় তেহরানও ওই সমঝোতার আওতায় নিজেদের সব অঙ্গীকার স্থগিত করেছে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। ফলে ইরানও আর ওই সমঝোতার বাধ্যবাধকতায় নিজেকে আবদ্ধ মনে করছে না।

টানা সপ্তম দিনের হামলা

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাতে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে তারা নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক রসদ কেন্দ্র, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

তবে ইরান দাবি করেছে, হামলার লক্ষ্যবস্তু শুধু সামরিক স্থাপনা ছিল না; বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে।

এরপর থেকেই বিশেষ করে দক্ষিণ ইরানে হামলার মাত্রা বাড়তে থাকে।

ইরানে প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষতি

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমোজগান প্রদেশে সর্বশেষ মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া হামলায় দুটি সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে।

খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা চালিয়েছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারের পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সুপেয় পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৬ জুলাই থেকে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০–এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

‘আর দু–তিন দিন হামলা চললে সর্বাত্মক অভিযান’

পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।

এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে প্রমাণ করেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।

অন্যদিকে তাঁর জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও দু–তিন দিন একইভাবে হামলা চালায়, তাহলে ইরান আবারও ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা

মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একাধিক উপসাগরীয় দেশে হামলার দাবি করেছে।

আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী—

কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে।
বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শেখ ইসা বিমানঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণাগার, বিমান আশ্রয়কেন্দ্র এবং সংযোগকারী সেতু লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে।
জর্ডানের আল-আজরাক সামরিক ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকেও হামলা চালানো হয়েছে।

কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি উৎপাদন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

তিন মাস পর সৌদি আরবেও হামলা

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন মাস পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে ইরান।

রাজধানী রিয়াদের কাছে আল-খারজের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু এলাকায় সতর্কসংকেত বেজে ওঠে।

ঘটনার সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র জানিয়েছে, আল-খারজ ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছেন।

তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ কিংবা ইরান—কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এ হামলা নিয়ে মন্তব্য করেনি।

জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহত

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন এবং আরেকজন নিখোঁজ হন।

আল–জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৬ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।

এর আগে প্রথম পর্যায়ের সংঘাতে ১৩ জন সেনা নিহত হন। পরে এক বিমান দুর্ঘটনায় আরও একজন মার্কিন পাইলটের মৃত্যু হয়।

যুদ্ধ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলার ধরন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধ এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার পরিধি যেমন বাড়ছে, তেমনি ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

তিন মাস পর সৌদি আরবে হামলা এবং সিরিয়ায় নতুন করে হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউট–এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেন, সংঘাত যে দিকে এগোচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তাঁর মতে, যুদ্ধ ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। আঞ্চলিক মধ্যস্থতার চেষ্টা থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া না হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স